Breaking News
Home / কৃষি সংবাদ / স্ট্রবেরি চাষ ও উপকারিতা

স্ট্রবেরি চাষ ও উপকারিতা

স্ট্রবেরি (Fragaria ananasa) হচ্ছে Rosaceae পরিবারভুক্ত একটি গুল্ম জাতীয় উদ্ভিদ। স্ট্রবেরি মূলত শীত প্রধান অঞ্চলের ফল। স্ট্রবেরি শীতকালীন দেশের ফল হলেও বর্তমানে বাংলাদেশের যেসব এলাকায় শীত বেশি পড়ে ও অনেক দিন স্থায়ী হয় সেসব এলাকায় বারি স্ট্রবেরি-১ নামে একটি উচ্চফলনশীল জাতের স্ট্রবেরি চাষ করা হচ্ছে। স্ট্রবেরির পাকা ফল টকটকে লাল রঙের হয়। এ ফলটি সুগন্ধিযুক্ত, টক ও মিষ্টি স্বাদের অত্যন্ত রসালো ও সুস্বাদু ফল।

স্ট্রবেরী গাছ দেখতে অনেকটা থানকুনি অথবা আলুর গাছের মত, তবে পাতা আরো বড় এবং চওড়া। এটি থানকুনি গাছের মতই রানারের মাধ্যমে চারা চারদিকে ছড়াতে থাকে। পাশ থেকে বের হওয়া পরিণত রানার কেটে আলাদা লাগিয়ে এর চাষ করা সম্ভব। তবে এর বীজ বর্তমানে পাওয়া যাচ্ছে। একটি স্ট্রবেরী গাছ থেকে রানারের মাধ্যমে বংশ বৃদ্ধি করলে বছরে কয়েকশত চারা উৎপাদন করা সম্ভব। স্ট্রবেরী শীত প্রধান দেশের ফল তাই বেশি তাপমাত্রার কারণে বাংলাদেশে এপ্রিল থেকে সেপ্টেম্বর মাস পর্যন্ত এ গাছ বাঁচিয়ে রাখা খুব কষ্টসাধ্য। স্ট্রবেরী ফল কাঁচা অবস্থায় সবুজ এবং পাকা অবস্থায় টকটকে লাল রঙের হয়। ফলটি দেখতে অনেকটা লিচুর মত।

পুষ্টিমানঃ স্ট্রবেরী জীবন রক্ষাকারী নানা পুষ্টি উপাদানে সমৃদ্ধ। এতে আছে ভিটামিন এ, সি, ই, ফলিক এসিড, সেলেনিয়াম, ক্যালসিয়াম, পলিফেনল, এলাজিক এসিড, ফেরালিক এসিড, কুমারিক এসিড, কুয়েরসিটিন, জ্যান্থোমাইসিন ও ফাইটোস্টেরল। এদের মধ্যে এলাজিক এসিড ক্যান্সার, বার্ধক্য, যৌনরোগ প্রতিরোধের গুণাগুণ আছে বলে জানা গেছে। স্ট্রবেরির মধ্যে কোলেস্টেরল, চর্বি ও সোডিয়ামের পরিমাণ খুবই কম। এছাড়া এর মধ্যে ভিটামিন এ, কে, ই, বি১, বি২, বি৩, ও বি৬ রয়েছে।

উপকারিতাঃ রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়ঃ স্ট্রবেরীতে আছে প্রচুর ভিটামিন সি যা রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করে এবং বিভিন্ন রকম সংক্রমণ থেকে শরীরকে রক্ষা করে। মাত্র এক কাপ স্ট্রবেরী প্রতিদিনের ভিটামিন সি এর চাহিদার ১০০% পূরণ করতে সক্ষম।

হার্টের অসুখের ঝুঁকি কমায়ঃ দেখতে কিছুটা হার্টের মত এই ফলটিতে আছে প্রচুর পরিমাণে ফ্ল্যাভনয়েড ও অ্যান্টি অক্সিডেন্ট।
এই উপাদান গুলো শরীরের খারাপ কোলেস্টেরলের মাত্রা কমিয়ে হৃদপিন্ড ভালো রাখতে সহায়তা করে। এছাড়াও স্ট্রবেরী রক্তনালীতে রক্ত জমাট বাঁধা প্রতিরোধ করে।
ডায়াবেটিস ও কোষ্ঠকাঠিন্যের সমস্যা দূর করেঃ স্ট্রবেরীতে আছে প্রচুর ফাইবার যা ডায়াবেটিস ও কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করতে সহায়তা করে। ফাইবার রক্তের চিনির পরিমাণ নিয়ন্ত্রণ করে এবং ডায়াবেটিসের মাত্রা নিয়ন্ত্রণ করে।
ক্যান্সারের ঝুঁকি কমায়ঃ অন্য সব ফল ও সবজির মত স্ট্রবেরীতেও আছে প্রচুর পরিমাণে অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট যা ক্যান্সার প্রতিরোধে সহায়তা করে। এছারাও স্ট্রবেরীতে আছে লুটেইন ও জিয়াথানাসিন যা ক্যান্সার কোষের বৃদ্ধি হ্রাস করে। এতে উপস্থিত ভিটামিন সি শরীরে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করে ক্যান্সারের ঝুঁকি কমায়।
ত্বকের জন্য ভালোঃ স্ট্রবেরীতে উপস্থিৎ ভিতামিন সি ও অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট ত্বককে বিভিন্ন ক্ষতিকর উপাদান থেকে রক্ষা করে। এছাড়াও নিয়মিত স্ট্রবেরী খেলে ত্বকে সহজে বার্ধক্যের ছাপ পরে না।
ওজন কমাতে সহায়কঃ স্ট্রবেরী ওজন কমাতে সহায়ক। স্ট্রবেরীতে ক্যালরীর পরিমাণ খুবই কম। এক কাপ স্ট্রবেরীতে আছে মাত্র ৫৩ ক্যালরী। স্ট্রবেরী খেলে বেশ অনেকক্ষন পেট ভরা থাকে। তাই স্ট্রবেরী ওজন কমানোর জন্য একটি সহযোগী খাবার।
গর্ভবতীদের জন্য উপকারীঃ গর্ভবতী নারীদের জন্য স্ট্রবেরী খুবই উপকারী খাবার। স্ট্রবেরী গর্ভের শিশুর মস্তিশক গঠনে সহায়তা করে এবং মা ও শিশুকে পুষ্টি সরবরাহ করে। তাই গর্ভবতী মায়েদের খাবার তালিকায় স্ট্রবেরী হতে পারে একটি আদর্শ খাবার।
হাড়ের জন্য ভালোঃ স্ট্রবেরীতে আছে ম্যাঙ্গানিজ, পটাশিয়াম ও কিছু মিনারেল যা হাড়ের স্বাভাবিক বৃদ্ধি বজায় রাখে। এছাড়াও এই উপাদান গুলো হাড়কে রাখে মজবুত ও সুস্থ। তাই বাড়ন্ত শিশুদের জন্য স্ট্রবেরী একটি উপকারী খাবার।
চুল পড়া রোধ করেঃ অনেকেই চুল পড়া নিয়ে বেশ সমস্যায় আছেন। যাদের চুল পড়ে যাচ্ছে তারা নিয়মিত স্ট্রবেরী খাওয়ার অভ্যাস করুন। স্ট্রবেরীতে আছে ফলিক এসিট, এল্লাজি এসিড, ভিটামিন বি ৫ ও ভিটামিন বি ৬ যা চুল পড়া প্রতিরোধ করে এবং চুলকে গোড়া থেকে মজবুত করতে সহায়তা করে। এছাড়াও এতে আছে কপার ও ম্যাগনেশিয়াম যা চুলের গোড়ায় খুসকি ও অন্য কোনো ফাঙ্গাল ইনফেকশন হতে দেয় না। স্ট্রবেরী চুলকে উজ্জ্বল করে তোলে এবং চুলের বৃদ্ধি বাড়ায়।
স্মৃতিশক্তি ভালো রাখেঃ স্ট্রবেরীতে আছে ফিসটেনিন নামের একটি ফ্ল্যাভনয়েড যা স্মৃতিশক্তি বাড়াতে সহায়তা করে। আন্যালস অফ নিওরোলোজিতে প্রকাশিত একটি রিসার্চে প্রমানিত হয়েছে যে সপ্তাহে মাত্র দুটি করে স্ট্রবেরী খেলেই মহিলাদের স্মৃতিশক্তি বেশিদিন ভালো থাকে।

রূপচর্চায় স্ট্রবেরিঃ
০১। স্ট্রবেরিতে রয়েছে কার্যকর ক্লিনজিং প্রপার্টিস। বিভিন্ন বিখ্যাত ব্র্যান্ড গুলোর ক্লিনজার, ফেইসওয়াশ, ফেইস মাস্ক তৈরিতে ব্যবহার করা হয় এই স্ট্রবেরির নির্যাস। স্ট্রবেরিতে থাকা ভিটামিন সি, স্যালিসাইলিক এসিড এবং এক্সফলিয়েন্টস মুখের মৃত কোষ দূর করে ত্বককে উজ্জ্বল করে এবং মুখের রোমকূপ টাইট করতে সাহায্য করে। এতে থাকা এলাজিক এসিড নামক এক ধরনের এন্টি অক্সিডেন্ট ত্বকের ড্যামেজ প্রতিরোধ করে ত্বককে সজীব এবং যৌবনদীপ্ত করে তোলে।
০২। মুখের বিভিন্ন দাগ দূর করতে স্ট্রবেরি বেশ কার্যকরী। এতে রয়েছে স্কিন লাইটেনিং প্রপার্টিস যা অসমান স্কিনটোন দূর করে ত্বকের উজ্জ্বলতা ফিরিয়ে আনে। স্ট্রবেরি ব্লেন্ড করে এর রস আলাদা করে একটি পাত্রে নিন। তুলার সাহায্যে রস ভালো মতো মুখে লাগিয়ে ১০-১৫ মিনিট রেখে ঈষদুষ্ণ পানি দিয়ে মুখ ধুয়ে ফেলুন। নিয়মিত ব্যবহারে ত্বক উজ্জ্বল এবং দাগমুক্ত হবে।
০৩। স্ট্রবেরি স্কিন টোনার হিসেবেও ব্যবহার করা যেতে পারে। ২ চা চামচ স্ট্রবেরি জুসের সাথে ৫০ মিলি গোলাপ জল ভালো মত মিশিয়ে তৈরি করতে পারেন স্ট্রবেরি স্কিন টোনার। এই টোনার ত্বকের বলিরেখা, ব্রণের দাগ দূর করতে খুব কার্যকরী। এটি ফ্রিজে ১০ দিন পর্যন্ত সংরক্ষণ করতে পারেন।
০৪। ২-৩ টি স্ট্রবেরি, ২ চা চামচ মধু, কয়েক ফোঁটা লেবুর রস মিশিয়ে পেস্ট করে মুখে লাগান। ১৫ মিনিট পর মুখ ধুয়ে ফেলুন। এই মাস্কটি ত্বককে ভেতর থেকে পরিষ্কার করে একে উজ্জ্বল এবং সুন্দর করে তোলে।
০৫। স্ট্রবেরিতে থাকা ফলিক এসিড, ভিটামিন B5 এবং ভিটামিন B6 চুল ঝরা রোধ করতে খুব কার্যকর। এক চা চামচ মধু, ৭-৮ টি স্ট্রবেরি এবং ৪-৫ চা চামচ টক দই ভালো মতো ব্লেন্ড করে এই মিশ্রণটি চুলে লাগান। এই হেয়ার মাস্কটি চুলের রুক্ষভাব দূর করে এবং চুল ঝরা রোধ করতে সাহায্য করে।
০৬। ৭-৮ টি স্ট্রবেরি ভালো মতো পেস্ট করে এতে ১ টেবিল চামচ মেয়োনিজ মিক্স করুন। এই মিশ্রণটি চুলে এবং স্ক্যাল্পে ভালো মতো লাগিয়ে ১৫-২০ মিনিট রাখুন। এরপর চুল ধুয়ে শ্যাম্পু করে ফেলুন। এটি ন্যাচারাল কন্ডিশনার হিসেবে কাজ করে এবং চুলের উজ্জ্বলতা বাড়িয়ে তোলে।
০৭। তৈলাক্ত ত্বকের জন্য সমান পরিমাণে স্ট্রবেরি এবং টক দই ভালো মতো মিশিয়ে মুখে লাগান। ১৫ মিনিট রেখে ধুয়ে ফেলুন। এই মাস্কটি ত্বকের অয়েলি ভাব কমিয়ে ত্বক নরম এবং মসৃণ করে।
০৮। চোখের ফোলাভাব এবং ডার্ক সার্কেল দূর করতে ব্যবহার করতে পারেন স্ট্রবেরি। স্ট্রবেরি পাতলা করে স্লাইস করে কেটে নিন। এরপর রিল্যাক্স ভাবে শুয়ে স্ট্রবেরি স্লাইস চোখের নীচে ১০-১৫ মিনিট রাখুন। এরপর পানি দিয়ে মুখ ধুয়ে ফেলুন। নিয়মিত ব্যবহারে ভালো ফল পাবেন।
০৯। চুলে ময়েশ্চার যোগাতে ৪-৫ টি স্ট্রবেরি এবং একটি ডিমের কুসুম ভালো মতো মিক্স করে চুলে লাগান। ৩০ মিনিট রেখে শ্যাম্পু করে ফেলুন। এটি চুলের রুক্ষভাব দূর করে চুল নরম করে তোলে।

About protidin khabor