ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দুই-তৃতীয়াংশের বেশি আসন পেয়ে নিরঙ্কুশ বিজয় অর্জন করেছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপি। ঘোষিত ফলের বিএনপি এককভাবে ২০৯ এবং দলটির নেতৃত্বাধীন জোট ২১২টি আসনে জয় পেয়েছে। রাজনীতি বিশ্লেষকদের অভিমত, দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে বিএনপি নেতারা ‘বিদ্রোহী’ প্রার্থী হিসেবে ভোটে না থাকলে নির্বাচনে দলটি আরও ভালো ফল করতে পারত। ‘বিদ্রোহী’রা নির্বাচনে থাকায় তৃণমূলে বিএনপির ভোট ভাগ হওয়ায় এর সুবিধা পেয়েছে জামায়াতে ইসলামী। এতে দলটি কয়েকটি আসন বেশি পেয়েছে। দলীয় নানান উদ্যোগের পরও শেষ পর্যন্ত অর্ধশতাধিক আসনে বিএনপির ‘বিদ্রোহী’ প্রার্থীরা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ছিলেন। অবশ্য তাদের মধ্য থেকে সাতজন বিজয়ী হন।
নির্বাচনে জামায়াত এককভাবে ৬৮টি এবং দলটির নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোট মোট ৭৭টি আসনে বিজয়ী হয়। বিএনপির ‘বিদ্রোহী’ প্রার্থী থাকায় জামায়াত জোট অন্তত ৭টি আসন বেশি পেয়েছে বলে অভিমত বিশ্লেষকদের। আসনগুলো হলো—ঢাকা-১২, ঢাকা-১৪, ঝিনাইদহ-৪, যশোর-৫, নড়াইল-২, সিলেট-৫ ও নারায়ণগঞ্জ-৪।
এবারের নির্বাচনে শরিকদের জন্য মোট ১৬টি আসন ছেড়ে দেয় বিএনপি। এর মধ্যে জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশ, বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টি, গণসংহতি আন্দোলন, গণঅধিকার পরিষদ এবং বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি-বিজেপি এই পাঁচটি দলকে আটটি আসন ছাড়ে। আর কৌশলগত কারণে অনেক শরিককে বিএনপিতে যোগদান করিয়ে ‘ধানের শীষ’ দেয়। এর মধ্যে আবার দুটি দল নিজেদের বিলুপ্ত করে শীর্ষ নেতা বিএনপিতে যোগদান করেন। ছেড়ে দেওয়া এই ১৬ আসনের ১২টিতেই বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী ছিলেন। তাদের মধ্যে ধানের শীষের তিনজন এবং নিজ নিজ দলীয় প্রতীকে জোটের তিনজন বিজয়ী হন।
রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ শিল্প এলাকা ঢাকা-১২ আসনটি গণতন্ত্র মঞ্চের শরিক দল বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হককে ছেড়ে দেয় বিএনপি। এ আসনে ধানের শীষ না পেয়ে বিদ্রোহী প্রার্থী হন ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির সাবেক আহ্বায়ক সাইফুল আলম নীরব। এখানে জামায়াতের প্রার্থী ছিলেন সাইফুল আলম। দাঁড়িপাল্লা প্রতীকে তিনি ২২ হাজার ১৮০ ভোটের ব্যবধানে জয় পান। ঘোষিত ফলে দেখা যায়, সাইফুল আলম পান ৫৩ হাজার ৭৭৩ ভোট। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী কোদাল প্রতীকের সাইফুল হক পান ৩০ হাজার ৯৬৩ ভোট। অন্যদিকে, ফুটবল প্রতীকে বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী সাইফুল আলম নীরব পান ২৯ হাজার ৮৬৯ ভোট।
ঢাকা-১৪ আসনে জামায়াতের প্রার্থী মীর আহমাদ বিন কাসেম জয়ী হয়েছেন। দাঁড়িপাল্লা প্রতীক নিয়ে তিনি মোট ১ লাখ ১ হাজার ১১৩ ভোট পান। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপির সানজিদা ইসলাম তুলি পান ৮৩ হাজার ৩২৩ ভোট। এ আসনে বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী এস এ সিদ্দিক সাজু ফুটবল প্রতীকে পান ১৬ হাজার ৩২৮ ভোট।
ঝিনাইদহ-৪ আসনে জামায়াতের দাঁড়িপাল্লা প্রতীকের প্রার্থী আবু তালিব ১ লাখ ৫ হাজার ৯৯৯ ভোট পেয়ে বিজয়ী হন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপির ‘বিদ্রোহী’ কাপ-পিরিচ প্রতীকের প্রার্থী সাইফুল ইসলাম ফিরোজ পান ৭৭ হাজার ১০৪ ভোট। আর বিএনপির ধানের শীষ প্রতীকের প্রার্থী রাশেদ খান পান ৫৬ হাজার ২২৪ ভোট। গণঅধিকার পরিষদের এই সাধারণ সম্পাদক বিএনপিতে যোগদান করে ধানের শীষ পান।
যশোর-৫ আসনে জামায়াতের দাঁড়িপাল্লা প্রতীকের প্রার্থী গাজী এনামুল হক ১ লাখ ৩২ হাজার ৮৫৮ ভোট পেয়ে বিজয়ী হন। বিএনপি থেকে মনোনয়ন বঞ্চিত হয়ে এ আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করা বিএনপির ‘বিদ্রোহী’ প্রার্থী শহীদ মো. ইকবাল হোসেন দ্বিতীয় হন। তার প্রাপ্ত ভোট ৮৫ হাজার ৫১৭। তৃতীয় হন বিএনপি জোট থেকে মনোনয়ন পাওয়া ধানের শীষের প্রার্থী ‘অনিবন্ধিত’ জমিয়তের যুগ্ম মহাসচিব রশিদ বিন ওয়াক্কাস। তার প্রাপ্ত ভোট ৫৫ হাজার ৪১৯।
নড়াইল-২ আসনে বিএনপি মনোনীত ধানের শীষের প্রার্থী ড. ফরিদুজ্জামান ফরহাদ ৪৫ হাজার ৪৬৩ ভোট পেয়ে তৃতীয় হন। জাতীয়তাবাদী সমমনা জোটের আহ্বায়ক ও এনপিপির এই চেয়ারম্যান বিএনপিতে যোগদান করে ধানের শীষ পান। এই আসনে জামায়াতের প্রার্থী অ্যাডভোকেট আতাউর রহমান বাচ্চু ১ লাখ ১৮ হাজার ১৬ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী কলস প্রতীক নিয়ে বিএনপির ‘বিদ্রোহী’ প্রার্থী মনিরুল ইসলাম পান ৭৭ হাজার ৪৪৫ ভোট। তিনি নড়াইল জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ছিলেন।
সিলেট-৫ আসনে জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় ঐক্যজোটের প্রার্থী খেলাফত মজলিসের মুফতি আবুল হাসান দেয়াল ঘড়ি প্রতীকে ৭৯ হাজার ৩৫৫ ভোট পেয়ে বিজয়ী হন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপি সমর্থিত জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশের সভাপতি মাওলানা উবায়দুল্লাহ ফারুক খেজুরগাছ প্রতীকে পান ৬৯ হাজার ৭৭৪ ভোট। আর তৃতীয় হন বিএনপির ‘বিদ্রোহী’ প্রার্থী মামুনুর রশিদ (চাকসু মামুন)। ফুটবল প্রতীকে তার প্রাপ্ত ভোট ৫৬ হাজার ৩৬৯।
নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনে জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটের প্রার্থী এনসিপির কেন্দ্রীয় নেতা আব্দুল্লাহ আল আমিন ‘শাপলা কলি’ প্রতীকে ১ লাখ ৬ হাজার ১৭১ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপি সমর্থিত জমিয়তের প্রার্থী মনির হোসাইন কাসেমী ৮০ হাজার ৬১৯ ভোট পান। বিএনপির ‘বিদ্রোহী’ প্রার্থী মোহাম্মদ শাহ আলম (হরিণ প্রতীক) ৩৯ হাজার ৩৮৩ ভোট পান।
জানতে চাইলে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. শামছুল আলম কালবেলাকে বলেন, দীর্ঘদিন পর দেশে একটা অবাধ-সুষ্ঠু নির্বাচনের পরিবেশ তৈরি হয় এবং বিএনপি এই নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে। কিন্তু দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করে বিএনপির অর্ধশতাধিক নেতা ‘বিদ্রোহী’ প্রার্থী হিসেবে ধানের শীষের বিরুদ্ধে নির্বাচন করেন। যারা এভাবে নির্বাচন করেছেন, তারা কিন্তু যথাযথ ভূমিকা পালন করেননি; তারা দলের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছেন। তাদের কারণেই বেশ কিছু আসনে বিএনপি ও বিএনপি সমর্থিত জোটের ভালো ভালো প্রার্থী পরাজয় বরণ করেছেন। আর এর সুবিধাটা নিয়েছে জামায়াতে ইসলামী। আরও কয়েকটা আসনে জামায়াতের প্রার্থীরা মাঝখান থেকে বের হয়ে গেছেন।
তিনি বলেন, বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান দীর্ঘদিন পর দেশে ফেরার পরপরই নির্বাচনী প্রচারে দারুণ ব্যস্ত হয়ে পড়েন। এর মধ্যেও যতটুকু সময় পেয়েছেন, দলের বেশ কয়েকজন বিদ্রোহী প্রার্থীকে ঢাকায় ডেকে কথা বলেছেন। তাদের মধ্যে দু-একজন ছাড়া বাকি সবাই তাদের মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারও করে নেন। আবার নির্বাচনের প্রাক্কালেও বিদ্রোহী অনেক প্রার্থী বিএনপির প্রার্থীর সমর্থনে নিজেদের প্রার্থিতা প্রত্যাহারের ঘোষণা দেন। তারপরও বিএনপির অনেক বিদ্রোহী প্রার্থী নির্বাচনে ছিলেন।
অধ্যাপক শামছুল আলম বলেন, যখন ঐক্যবদ্ধ থাকা সবচেয়ে বেশি জরুরি, তখন দলের সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে নির্বাচনে ধানের শীষের বিরুদ্ধে স্বতন্ত্র প্রার্থী হন অনেক নেতা। এ বিষয়টি বিএনপির হাইকমান্ডের বিবেচনায় নেওয়া দরকার। যদিও নির্বাচনে বিএনপির যেসব বিদ্রোহী প্রার্থী ছিল, তাদের দল থেকে অনেক আগেই বহিষ্কার করা হয়। এখন তাদের আবার যদি দলের মধ্যে ফিরিয়ে নেওয়া হয়, তাহলে কিন্তু পরবর্তী সময়ে আবার একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটতে পারে। দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গকারীরা হয়তো মনে করবে, দল তো আবার ফেরত নেবেই, আমি নির্বাচনে বিদ্রোহী হয়ে দাঁড়িয়ে যাই। এতে করে দলের আবার ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি থাকবে।