
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের শুল্ক আরোপ নীতিকে নিজেদের পক্ষে কাজে লাগিয়ে ভবিষ্যতে বৈশ্বিক বাণিজ্যে প্রভাব বিস্তার করতে চাচ্ছে চীন। বেইজিং মনে করছে, ট্রাম্পের ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ বা সুরক্ষাবাদী নীতির কারণে তৈরি হওয়া অনিশ্চয়তা তাদের জন্য নতুন সুযোগ তৈরি করেছে।
চীন চেষ্টা করছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন, উপসাগরীয় দেশগুলো এবং ট্রান্সপ্যাসিফিক অঞ্চলের বাণিজ্য জোটগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক আরও গভীর করতে। তাদের লক্ষ্য, বিশ্বের বৃহত্তম অর্থনৈতিক ব্লকগুলোর সঙ্গে উৎপাদনভিত্তিক অর্থনীতিকে আরও শক্তভাবে যুক্ত করা, যাতে যুক্তরাষ্ট্রের চাপের প্রভাব কমানো যায়।
রয়টার্সের বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ২০১৭ সাল থেকে চীনের রাষ্ট্র-সমর্থিত নীতিনির্ধারক ও গবেষকরা প্রায় দুই হাজারটির বেশি গবেষণাপত্রে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য কৌশল বিশ্লেষণ করেছেন। এসব গবেষণার একটি বড় অংশ প্রকাশ করেছে চায়নিজ একাডেমি অব সোশ্যাল সাইয়েন্সেস ও পিকিং ইউনিভার্সিটির সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা।
সম্প্রতি কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নির বেইজিং সফরে দুই দেশের মধ্যে একটি চুক্তি হয়, যেখানে চীনা বৈদ্যুতিক গাড়ির ওপর শুল্ক কমানো হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রের মতে, এটি যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব ভাঙার লক্ষ্যে নেওয়া একাধিক চুক্তির প্রথম ধাপ।
এদিকে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং বিশ্বজুড়ে কূটনৈতিক তৎপরতা বাড়িয়েছেন। চীন ৫৩টি আফ্রিকান দেশের পণ্যের ওপর শূন্য শুল্ক চালুর ঘোষণা দিয়েছে। পাশাপাশি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তানির্ভর কাস্টমস ব্যবস্থা ও ডিজিটাল অবকাঠামো উন্নয়নের প্রস্তাব দিচ্ছে বিভিন্ন দেশকে।
চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে সম্ভাব্য মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির প্রস্তাব তুলেছেন। একই সঙ্গে উপসাগরীয় সহযোগিতা সংস্থার (জিসিসি) সঙ্গে দীর্ঘদিনের আলোচনা দ্রুত শেষ করার আহ্বান জানিয়েছেন।
চীন যোগ দিতে আগ্রহী কম্প্রিহেনসিভ অ্যান্ড প্রোগ্রেসিভ অ্যাগ্রিমেন্ট ফর ট্রান্সপ্যাসিফিক পার্টারশিপে (সিপিটিপিপি), যা মূলত যুক্তরাষ্ট্র-সমর্থিত ট্রান্সপ্যাসিফিক পার্টনারশিপ (টিপিপি) থেকে গড়ে ওঠে। যদিও সদস্য দেশগুলোর কিছু অংশ চীনের বিশাল বাণিজ্য উদ্বৃত্ত ও অতিরিক্ত উৎপাদন নিয়ে উদ্বিগ্ন।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, চীনের ১.২ ট্রিলিয়ন ডলারের বাণিজ্য উদ্বৃত্ত অন্যান্য দেশের শিল্প খাতের জন্য ঝুঁকি তৈরি করছে। বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার সাবেক মহাপরিচালক পাসকাল ল্যামি মন্তব্য করেছেন, ইউরোপে চীনা পণ্যের প্রবাহ এত বেশি যে, বাজার তা পুরোপুরি গ্রহণ করতে পারছে না। এ ছাড়া, অনেক দেশ এখনো যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে প্রবেশাধিকার হারানোর ঝুঁকি নিতে চায় না। ফলে চীনের প্রস্তাবিত মুক্ত বাণিজ্য চুক্তিগুলো বাস্তবায়নে সময় লাগতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, চীন এখন ডিকাপলিং বা যুক্তরাষ্ট্র থেকে বিচ্ছিন্নতার বিপরীতে বৈশ্বিক বাণিজ্যে আরও গভীরভাবে যুক্ত হওয়ার কৌশল নিয়েছে। তারা মনে করছে, আন্তর্জাতিক মান নির্ধারণ, ডিজিটাল বাণিজ্য ও আঞ্চলিক জোটে সক্রিয় অংশগ্রহণের মাধ্যমে ভবিষ্যতে নিজেদের কেন্দ্রীয় অবস্থান নিশ্চিত করতে পারবে। তবে অর্থনীতিবিদদের মতে, দীর্ঘমেয়াদে সফল হতে হলে চীনকে অভ্যন্তরীণ ভোগব্যয় বাড়াতে হবে এবং অর্থনীতির ভারসাম্য আনতে হবে। অন্যথায়, বৈশ্বিক অংশীদারদের আস্থা অর্জন কঠিন হতে পারে।
সবমিলিয়ে, ট্রাম্প প্রশাসনের বাণিজ্য নীতির ফলে তৈরি হওয়া পরিস্থিতিকে কাজে লাগিয়ে চীন বৈশ্বিক বাণিজ্য ব্যবস্থায় নিজের প্রভাব আরও সুসংহত করার পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করছে।
মন্তব্য করুন