গাজীপুর সদর ও গাছা থেকে টঙ্গীকে বিভক্ত করার সীমানা রেখায় অবস্থিত তুরাগ নদীর সংযোগ খাল। আঞ্চলিকভাবে খালটিকে গাছা খাল, টঙ্গী খাল বা নিমতলী খালও বলা হয়।
১২.০৫ কিলোমিটার দীর্ঘ ঐতিহ্যবাহী প্রাচীন এই খালটি গাছা এলাকা থেকে উত্তরখাইলকুর বাঁকাব্রীজ, মইরান সেতু, বগারটেক সেতু, শুকুন্দিবাগ, গাজীপুরা, বনমালা, হায়দ্রাবাদ ও নিমতলী হয়ে তুরাগে মিশেছে। ১৯৮০ সালে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এই খাল খননের উদ্যোগ নিলেও পরে আর তা বাস্তবায়িত হয়নি।
সবশেষ অন্তর্বর্তীকালীন সরকার কাজ শুরু করার কথা বললেও শেষ পর্যন্ত তা হয়নি। তবে বর্তমান সরকার খালটি উদ্ধারের উদ্যোগ নিয়েছে বলে জানিয়েছেন পানিসম্পদ মন্ত্রী।
অনুসন্ধানে জানা যায়, গাজীপুরের পৌনে ২০০ বছরের প্রাচীন গাছা খাল বাংলাদেশের ঐতিহাসিক ও প্রাকৃতিক ওয়াটার ওয়েজের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এটি কেবল পরিবেশগত দিক দিয়ে গুরুত্বপূর্ণ নয়, বরং স্থানীয় ইতিহাস ও জীবিকা- নির্ভরতার সঙ্গেও জড়িত।
মাছ, পানিচর পাখি এবং অন্যান্য জলজ প্রাণীর আবাসস্থল হিসেবে এর যথেষ্ট পরিচিতি রয়েছে। একই সঙ্গে, স্থানীয় কৃষক ও মানুষদের সেচ এবং জল সরবরাহের জন্যও খালটি গুরুত্বপূর্ণ।
খাল খননের উদ্যোগ
অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ২০২৫ সালে গাছা খাল উন্নয়নের উদ্যোগ নেয়। ২০২৫ সালের আগস্টে শুরু হয়ে ২০২৮ সালের জুনের মধ্যে কাজ শেষ করার কথা বলা হয়। কার্যাদেশে গত বছরের ৩০ অক্টোবর থেকে ২০২৭ সালের ২ জুনের মধ্যে খালটির উন্নয়ন, সৌন্দর্যবর্ধন ও পরিবেশ সংরক্ষণমূলক কাজ করতে ৮৩.৬২ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। পরিবেশ, বন ও জলবায়ূ পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের অধীনে বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তন ট্রাস্টের অর্থায়নে ও বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের বাস্তবায়নে এই কাজ শুরু হয়েছে বলা হলেও দৃশ্যত তেমন কিছু চোখে পড়েনি। এই অবস্থায় বর্তমান সরকারের আমলে গত ৩ মার্চ পানিসম্পদ মন্ত্রী শহীদ উদ্দীন চৌধুরী এ্যানি খালটি পরিদর্শন করে খননের প্রতিশ্রতি দেন।
পরিদর্শনকালে উপস্থিত ছিলেন গাজীপুর-২ আসনের সংসদ সদস্য এম মঞ্জুরুল করিম রনি, গাজীপুর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মো. শওকত হোসেন সরকার, গাজীপুর মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার ইসরাইল হাওলাদার এবং গাজীপুর সিটি করপোরেশন ও এর সংশ্লিষ্ট দপ্তরের কর্মকর্তারা।
সরেজমিনেসোমবার সংশ্লিষ্ট এলাকায় গিয়ে জানা যায়, গাজীপুরের ঐতিহ্যবাহী এই খাল ক্রমেই বিলীন হওয়ার পথে। এর পাশের জমি দখল, আবর্জনা ফেলার কারণে এবং পর্যাপ্ত পরিচর্যার অভাবে খালটি সরু হয়ে যাচ্ছে। বিভিন্ন আবাসন কম্পানি ও স্থানীয় প্রভাবশালী মহল খালের তীর দখল করে গড়ে তুলেছেন স্থাপনা। খালের দুই পাশে বসানো রয়েছে অসংখ্য দখলীয় সাইনবোর্ড।
এছাড়া কলকারখানার কালো বর্জ্য এই খাল দিয়ে প্রবাহিত হয়ে পরিবেশ দূষিত করছে। পাশাপাশি ময়লা আবর্জনা ফেলে খালের গতিপথ পরিবর্তন করে ফেলা হচ্ছে। ময়লার সঙ্গে ক্ষতিকর প্লাস্টিক পরিবেশকে মারাত্মক দূষিত করছে। খালের পচা পানি সেখানে ফেলা ময়লার দুর্গন্ধ বাতাসের সঙ্গে মিশে খালপাড়ের বাসিন্দাদের জীবন অতিষ্ঠ করে তুলছে। খালের দূষিত জীবানু বাতাসের সঙ্গে মিশে মানুষের শরীরে নানা জটিল রোগ সৃষ্টি করছে।
স্থানীয় বাসিন্দা সাব্বির বলেন, এই খাল আমাদের শিশুদের খেলার জায়গা, কৃষিকাজ ও প্রাকৃতিক জলস্রোতের অন্যতম উৎস ছিল। খাল বিলীন হলে পরিবেশ ও জীবনযাত্রায় বড় ক্ষতি হবে। পরিবেশবিদরা সতর্ক করে বলছেন, অবিলম্বে খনন ও সংরক্ষণ কার্যক্রম শুরু না করলে আগামী কয়েক বছরের মধ্যে খালটি পুরোপুরি বিলীন হয়ে যাবে।
টঙ্গীর বনমালা এলাকার হোটেল মালিক ইসমাইল কালের কণ্ঠকে বলেন, খালটি প্রায় বিলীন হয়ে গেছে। রক্ষা না করলে আর পাওয়া যাবে না।
গাজীপুরা এলাকার বাসিন্দা ইসমত আরা বলেন, খালের পানির গন্ধ বিষাক্ত। এতে রোগ জীবানু ছড়াচ্ছে। প্রতিকার চাই আমরা।
এই অবস্থায় স্থানীয় নাগরিক কমিটি ও বিভিন্ন পরিবেশবাদী সংগঠন ইতোমধ্যেই খালের পুনঃখনন ও সংরক্ষণের জন্য অবিলম্বে উদ্যোগ নেওয়ার দাবি তুলেছে।