জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময়ের একটি হত্যা মামলায় প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা মহাপরিদপ্তরের (ডিজিএফআই) সাবেক পরিচালক বরখাস্ত লেফটেন্যান্ট কর্নেল আফজাল নাছেরকে ছয় দিনের রিমান্ডে নেওয়া হয়েছে। গতকাল সোমবার ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট হাসিব উল্লাহ পিয়াসের আদালত এই রিমান্ড মঞ্জুর করেন। এর আগে গত রোববার রাতে রাজধানীর মিরপুর ডিওএইচএস এলাকার বাসা থেকে তাঁকে গ্রেপ্তার করে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)।
এদিকে এক-এগারোর সময়ের ভূমিকার বিষয়েও তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে বলে জানা গেছে। গতকাল আদালতে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী অভিযোগ করেন, আফজাল নাছের ওই সময় বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে নির্যাতনকারী দলটিতে ছিলেন। এ ছাড়া তিনি সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়াকে গুলশানের ইউনাইটেড হাসপাতালে চিকিৎসা নিতেও বাধা দিয়েছেন।
সম্প্রতি গ্রেপ্তার এক-এগারোর সময়ের সাবেক দুই সেনা কর্মকর্তা মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী ও শেখ মামুন খালেদকেও রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে।
ডিবির যুগ্ম-কমিশনার মোহাম্মদ নাসিরুল ইসলাম সমকালকে বলেন, ফল ব্যবসায়ী দেলোয়ার হত্যা মামলায় জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তাঁকে আদালতে হাজির করে সাত দিনের রিমান্ডে চাওয়া হয়। শুনানি শেষে বিচারক ছয় দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। মামলার অভিযোগ এবং সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয়ে তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে।
ডিবির রিমান্ড আবেদনে বলা হয়, ভুক্তভোগী দেলোয়ার হোসেন ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই বিকেলে ছাত্র আন্দোলনের পক্ষে মিরপুর-১০ নম্বর ফলপট্টিতে অবস্থান নেন। তখন এ মামলার এজাহারভুক্ত আসামিসহ আওয়ামী লীগের অঙ্গ সংগঠনের অজ্ঞাতনামা ৫০০ থেকে ৭০০ জন আফজাল নাছেরের নির্দেশে নির্বিচারে গুলি চালায়। এতে দেলোয়ার গুলিবিদ্ধ হয়ে ঘটনাস্থলে লুটিয়ে পড়েন। চিকিৎসাধীন অবস্থায় ২১ জুলাই তিনি মারা যান। এ সংক্রান্ত মামলার প্রাথমিক তদন্তে সন্দিগ্ধ আসামি হিসেবে আফজাল নাছেরের ঘটনায় জড়িত থাকার বিষয়ে পর্যাপ্ত তথ্যপ্রমাণ পাওয়া গেছে। মামলার মূল রহস্য উদ্ঘাটন ও সুষ্ঠু তদন্তের স্বার্থে আসামিকে নিবিড়ভাবে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য রিমান্ড প্রয়োজন।
সাবেক সেনা কর্মকর্তা আফজাল নাছের ২০০৬ সালের মার্চ থেকে ২০০৮ সালের মার্চ পর্যন্ত ডিজিএফআইতে দায়িত্ব পালন করেন। ২০০৯ সালের ৫ নভেম্বর তিনি বরখাস্ত হন। তাঁর বাড়ি নোয়াখালীর সেনবাগে। সেনাবাহিনীর চাকরিতে যোগ দেন ১৯৮৪ সালের ৪ জুলাই। গতকাল তাঁর রিমান্ডের পক্ষে আদালতে শুনানি করেন ঢাকা মহানগর পাবলিক প্রসিকিউটর ওমর ফারুক ফারুকী। তিনি বলেন, ‘মঈন উদ্দিন-ফখরুদ্দীনের আমলে রাজনৈতিক নেতাকর্মী, ব্যবসায়ীদের অত্যাচার করেছিল ডিজিএফআই। বিশেষ করে বিএনপি নেতাকর্মীদের। তারেক রহমানকেও অন্যায়ভাবে গ্রেপ্তার করে নির্যাতন করা হয়। সেই টিমের সদস্য ছিলেন আফজাল নাছের। তিনি রাজনৈতিক ব্যক্তি, বিশেষ করে বিএনপির নেতাকর্মীদের দমন ও নির্যাতন করেছেন। তখন আবদুল আউয়াল মিন্টু, লুৎফুজ্জামান বাবর, মোসাদ্দেক আলী ফালুকে মিথ্যাচার করে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল।’
এই আইনজীবী বলেন, ‘অত্যাচার করেও তাঁর জিঘাংসা শেষ হয়নি। ফ্যাসিস্ট হাসিনা তিনবারের প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়াকে মামলার পর মামলা দিয়ে পঙ্গু করে দিয়েছিল, মিথ্যা মামলায় সাজা দিয়ে তাঁকে জেলে আটকে রেখে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিয়েছিল। তাঁকে বিদেশে চিকিৎসা নিতে দেওয়া হয়নি। নিরূপায় হয়ে তাঁকে ইউনাইটেড হাসপাতালে নেওয়া হয়। তবে ইউনাইটেড গ্রুপের প্রশাসনিক কর্মকর্তা হওয়ায় তিনি (নাছের) খালেদা জিয়াকে চিকিৎসা নিতে দেননি। সেনাবাহিনী থেকে বরখাস্ত হয়েও তিনি নানাভাবে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করেছেন। তিনি ফ্যাসিস্ট হাসিনার সহযোগী ছিলেন। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে হাসিনাকে রক্ষা করার জন্য কাজ করেছেন।’
অন্যদিকে আসামিপক্ষের আইনজীবী হেলাল উদ্দিন রিমান্ড বাতিল ও জামিন চেয়ে আবেদন করেন। শুনানিতে তিনি বলেন, ‘এই মামলায় আসামির নাম ছাড়া সুনির্দিষ্ট কোনো অভিযোগ নেই। বিগত দিনে যদি তিনি আওয়ামী লীগের পক্ষে কাজ করতেন, তাহলে আওয়ামী লীগ তাঁকে পুরস্কৃত করত। তবে তাঁকে বরখাস্ত করা হয়েছে। তিনি রুটি-রুজির জন্য ইউনাইটেড গ্রুপে চাকরি করেন। তাঁর রিমান্ড বাতিল করে জামিনের আবেদন করছি।’
অভিযোগ অস্বীকার করছেন খালেদ
দেলোয়ার হোসেন হত্যা মামলায় রিমান্ডে থাকা আরেক আসামি ডিজিএফআইর সাবেক মহাপরিচালক শেখ মামুন খালেদকে বিভিন্ন বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। ২০১০ সালের ১৩ নভেম্বর খালেদা জিয়াকে সেনানিবাসের বাসা থেকে উচ্ছেদের ঘটনায় তাঁর ভূমিকা প্রসঙ্গেও গতকাল জানতে চাওয়া হয়। বিশেষ করে ওই বাসায় মদের বোতল সাজিয়ে রেখে সাবেক প্রধানমন্ত্রীর চরিত্র হননের চেষ্টার বিষয়ে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি নিজের সংশ্লিষ্টতা অস্বীকার করেন। তবে তিনি জানান, কয়েকজন সেনা কর্মকর্তা এর সঙ্গে জড়িত ছিলেন।