এক সপ্তাহ ধরে তীব্র জ্বরে ভোগার পর অবশেষে ম্যালেরিয়ার কাছে হার মানতে হয়েছে ১০ বছর বয়সী সুদীপ্তা চাকমাকে। গত বছরের জুলাই মাসে পার্বত্য জেলা রাঙামাটিতে তার মৃত্যু হয়। দীর্ঘ ৯ বছর পর ম্যালেরিয়ায় প্রথম মৃত্যুর ঘটনা ঘটল এ জেলায়। শুধু সুদীপ্তাই নয়, গত বছর এ জেলায় আরও একজনের মৃত্যু হয়েছে মশাবাহিত রোগ ম্যালেরিয়ায়।
জেলা স্বাস্থ্য অফিসের তথ্য অনুযায়ী, এ এলাকায় ম্যালেরিয়া নিয়ন্ত্রণে চলে এসেছিল বলে ধারণা করা হচ্ছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক মৃত্যুগুলো স্বাস্থ্য বিভাগের জন্য নতুন করে ভীতি ও শঙ্কার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
২০২৫ সালে দেশে ম্যালেরিয়ায় যত মানুষের মৃত্যু হয়েছে, তা গত ৯ বছরের পরিসংখ্যানের মধ্যে সর্বোচ্চ। প্রাণঘাতী এই রোগ মূলত দেশের পার্বত্য অঞ্চলে বেশি দেখা যায়। যদিও আগের বছরের তুলনায় সামগ্রিক প্রকোপ কিছুটা কমেছে বলে মনে করা হচ্ছে। কিন্তু যে হারে এটি নির্মূল হওয়ার কথা ছিল, বাস্তবে তা হচ্ছে না; বরং কোনো কোনো এলাকায় হঠাৎ রোগীর সংখ্যা জ্যামিতিক হারে বেড়ে যাচ্ছে।
মশার বংশবৃদ্ধির সঙ্গে তাপমাত্রার পরিবর্তনের একটি গভীর ও নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে। বাংলাদেশে সাম্প্রতিক সময়ে জলবায়ুর এ পরিবর্তনগুলো অত্যন্ত স্পষ্ট। এ প্রাকৃতিক পরিবর্তন মানুষের কর্মকাণ্ডের ফলে ত্বরান্বিত হলেও আশু ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ কম। কিন্তু যেসব বিষয়ে মানুষের নিয়ন্ত্রণ বা হাত রয়েছে, যেমন মশা নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচি, দক্ষ নগর ব্যবস্থাপনা, সঠিক নগর-পরিকল্পনা এবং জনস্বাস্থ্য কাঠামোর আধুনিকায়ন, সেগুলো বাস্তবায়নে বেশ ঘাটতি লক্ষ করা যাচ্ছে।
ম্যালেরিয়া মূলত ‘অ্যানোফিলিস’-জাতীয় মশার কামড়ে ছড়ায়। তবে বর্তমানে কেবল অ্যানোফিলিস নয়, আরও নানা প্রজাতির মশার বিস্তার আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে। এর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে বিভিন্ন মশাবাহিত রোগের প্রকোপও। গবেষকেরা দেখছেন, মশা এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি নতুন নতুন এলাকায় ছড়িয়ে পড়ছে। দেশে বর্তমানে ডেঙ্গু, ম্যালেরিয়া, জিকা ও চিকুনগুনিয়া—এই চার প্রধান মশাবাহিত রোগ জনস্বাস্থ্যের জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর মধ্যে ডেঙ্গু ও ম্যালেরিয়া দীর্ঘদিনের সমস্যা হলেও জিকা ও চিকুনগুনিয়ার প্রকোপ ২০২৪ সাল থেকে নতুন করে বাড়তে শুরু করেছে।
বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, ভবিষ্যতে দেশে নতুন নতুন প্রজাতির মশা ও অজানা মশাবাহিত রোগের প্রকোপ দেখা দিতে পারে। বর্তমানে দেশে কিউলেক্স মশার উপদ্রব সবচেয়ে বেশি। গবেষণায় দেখা গেছে, কিউলেক্স মশার কামড়েও ফাইলেরিয়া ও জাপানি এনসেফালাইটিসের মতো রোগ হতে পারে। বাংলাদেশে এই দুই রোগের বিস্তার এখন পর্যন্ত কম হলেও বিশেষজ্ঞরা মোটেও শঙ্কামুক্ত নন, বিশেষ করে জাপানি এনসেফালাইটিসে মৃত্যুঝুঁকি অত্যন্ত বেশি
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলছেন, মশাবাহিত রোগগুলো আগামী দিনে বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হতে যাচ্ছে। এ চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় বর্তমানের নগর ব্যবস্থাপনা ও স্বাস্থ্য পরিকল্পনায় আমূল পরিবর্তন আনা প্রয়োজন। কিন্তু সরকারের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে এ সমস্যার দিকে খুব বেশি গুরুত্ব বা দৃষ্টি দেওয়া হচ্ছে না।
এ পরিস্থিতির সুযোগে মশা নিধনকারী কয়েল, স্প্রেসহ নানা সামগ্রীর রমরমা ব্যবসা চলছে। বাজারে পাওয়া এসব সামগ্রী কতটুকু মানসম্পন্ন বা স্বাস্থ্যের জন্য কতটা নিরাপদ, তা নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন রয়ে গেছে। তদারকির অভাব সত্ত্বেও ব্যক্তিগত সুরক্ষা ও রোগের ভয়ে সাধারণ মানুষ বাধ্য হয়ে এসব সামগ্রী কিনছেন।
তাপ বৃদ্ধি আর জলবায়ুর পরিবর্তন মশার আদর্শ পরিবেশ
গত দুই দশকে বাংলাদেশে বৃষ্টির ধরনে আমূল পরিবর্তন এসেছে। বর্ষার সময় কম বৃষ্টি এবং বর্ষার পর অতিবৃষ্টি মশার বংশবৃদ্ধিতে ব্যাপক সহায়তা করছে। এ ছাড়া গড় তাপমাত্রা বৃদ্ধির ফলে মশার প্রজনন হার বেড়েছে। আন্তর্জাতিক সাময়িকী এনভায়রনমেন্টাল হেলথ পারসপেকটিভ-এ প্রকাশিত একটি বৈজ্ঞানিক পর্যালোচনা থেকে জানা যায়, তাপমাত্রা বৃদ্ধি, বৃষ্টিপাতের ধরন এবং আর্দ্রতার ওঠানামা মশার জীবনচক্র ও ভাইরাস সংক্রমণের ক্ষমতাকে সরাসরি প্রভাবিত করে।
ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক মোহাম্মদ জাহেদুর রহমান এক গবেষণায় দেখিয়েছেন, গত ৩০ বছরে বাংলাদেশের বার্ষিক গড় সর্বোচ্চ তাপমাত্রা বৃদ্ধির হার ছিল প্রতিবছর ০.০১৮৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস। বিশেষ করে শীতকাল আগের চেয়ে উষ্ণ হচ্ছে, যা মশার বংশবিস্তারের মৌসুমকে দীর্ঘায়িত করছে। গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে, মশার প্রজননের জন্য ২৬ থেকে ৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা আদর্শ। বাংলাদেশের বর্তমান গড় তাপমাত্রা (২৫ থেকে ৩১ ডিগ্রি সেলসিয়াস) মশা ও পরজীবী উভয়ের জন্যই অত্যন্ত অনুকূল পরিবেশ তৈরি করছে। ফলে ভবিষ্যতে বাংলাদেশে ডেঙ্গু ও অন্যান্য মশাবাহিত রোগের ঝুঁকি আরও দীর্ঘ সময় ধরে থাকার প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে।
‘ডিসপারিটিজ ইন রিস্কস অব ম্যালেরিয়া অ্যাসোসিয়েটেড উইথ ক্লাইমেটিক ভ্যারিয়াবিলিটি অ্যামাং উইমেন, চিলড্রেন অ্যান্ড এলডারলি ইন দ্য চিটাগং হিল ট্র্যাক্টস অব বাংলাদেশ’ শীর্ষক একটি গবেষণায় দেখা গেছে, আবহাওয়ার পরিবর্তন পার্বত্য অঞ্চলে ম্যালেরিয়ার ঝুঁকিকে বিভিন্নভাবে প্রভাবিত করছে। তাপমাত্রা বৃদ্ধি পেলে মশার প্রজনন ও জীবাণুর বিকাশ দ্রুত হয়। গবেষণায় উঠে এসেছে, অতিরিক্ত বৃষ্টির সময় শিশু ও বয়স্কদের সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়ে, আর তাপমাত্রা বৃদ্ধির সময় নারীদের মধ্যে ম্যালেরিয়ার প্রবণতা বেশি দেখা যায়।