ঠাকুরগাঁও-১ (সদর, রুহিয়া ও ভুল্লী) আসনের উপনির্বাচনে অনিয়ম, জালভোট, মারধর করে পোলিং এজেন্টদের কেন্দ্র থেকে বের করে দেওয়া এবং কর্মী-সমর্থকদের ওপর হামলার অভিযোগ তুলেছে জামায়াতে ইসলামী। এসব অভিযোগে নির্বাচন প্রত্যাখ্যান করে বিক্ষোভ ও প্রতিবাদ সমাবেশের ডাক দিয়েছে দলটি।
প্রথমে আজ শুক্রবার বিকেলে কর্মসূচি পালনের ঘোষণা দিলেও নির্বাচনী আচরণবিধির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে তা এক দিন পিছিয়ে আগামীকাল শনিবার করার কথা জানিয়েছেন জামায়াতের প্রার্থী দেলাওয়ার হোসেন।
গতকাল বৃহস্পতিবার এই আসনের উপনির্বাচনে ভোট গ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়। রাত পৌনে ১০টার দিকে উপনির্বাচনের রিটার্নিং কর্মকর্তা ও জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা কামরুল ইসলাম ফলাফল ঘোষণা করেন। এতে ২ লাখ ২৭ হাজার ৯১৭ ভোট পেয়ে বেসরকারিভাবে নির্বাচিত হয়েছেন বিএনপির প্রার্থী মির্জা ফয়সল আমীন। তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতের প্রার্থী দেলাওয়ার হোসেন পেয়েছেন ৯৬ হাজার ৫১৩ ভোট।
এর আগে গতকাল রাত ৯টার দিকে ঠাকুরগাঁও শহরের জামায়াতে ইসলামীর কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলন করেন দেলাওয়ার হোসেন। সেখানে নির্বাচনে বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগ তুলে ফলাফল প্রত্যাখ্যান করেন। তিনি বলেন, শুরু থেকেই এই নির্বাচন নিয়ে তাঁদের আশঙ্কা ছিল। ঠাকুরগাঁওয়ের উপনির্বাচনেও প্রচারণার শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত সরকারি দলের প্রার্থী ও তাঁর সমর্থকেরা আচরণবিধি লঙ্ঘন করেছেন।
দেলাওয়ার হোসেনের অভিযোগ, পুরো নির্বাচনী এলাকায় ভীতিকর পরিবেশ তৈরি করা হয়েছিল। ভোটারদের ধানের শীষে ভোট না দিলে বাড়িতে থাকতে দেওয়া হবে না এবং তাঁদের দেখিয়ে ব্যালটে সিল মারতে হবে—এমন হুমকি দেওয়া হয়েছে। ভোটের দিন সকালে কেন্দ্রগুলোয় ভোটাদের উপস্থিতি কম থাকলেও পরে সরকারি দলের লোকজন বাড়ি বাড়ি গিয়ে ভোটারদের ভয়ভীতি দেখানোর পাশাপাশি টাকা দিয়ে কেন্দ্রে নিয়ে ধানের শীষে ভোট দিতে বাধ্য করেছেন।
ভোটের হার নিয়েও প্রশ্ন তোলেন জামায়াতের এই প্রার্থী। তাঁর ভাষ্য, ভোটের দিন কেন্দ্রগুলোয় ৫০ শতাংশ ভোট পড়ার মতো উপস্থিতি তাঁরা দেখেননি। অথচ ফলাফলে ৬৪ শতাংশ ভোট পড়েছে বলে দেখানো হয়েছে। নির্দিষ্ট কয়েকটি ভোটকেন্দ্রে অনিয়মের অভিযোগও তুলে ধরেন দেলাওয়ার হোসেন।
ভোট গ্রহণের দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তাদের নিয়োগ নিয়েও প্রশ্ন তোলেন জামায়াতের প্রার্থী। তিনি বলেন, ভোটে কারচুপি করতেই কেন্দ্রে কেন্দ্রে আসল প্রিসাইডিং ও সহকারী প্রিসাইডিং কর্মকর্তাদের সরিয়ে দলীয় লোকজনকে বসানো হয়েছিল। এ কারণেই পরিচয়পত্রে ছবি রাখা হয়নি। পোলিং এজেন্টদের ওপর হামলার কয়েকটি ঘটনার বিবরণও দেন এই প্রার্থী।
গতকাল রাত ১১টার দিকে ঠাকুরগাঁও ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালে আহত কর্মী-সমর্থকদের দেখতে যান দেলাওয়ার হোসেন। হাসপাতাল থেকে বেরিয়ে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, ‘ভোটে অনিয়ম, জালভোট ও কর্মী-সমর্থকদের ওপর হামলার প্রতিবাদে শুক্রবার বিক্ষোভ ও সমাবেশের কর্মসূচি দেওয়া হয়েছিল। তবে নির্বাচনী আচরণবিধি অনুযায়ী, ভোট গ্রহণ শেষ হওয়ার ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে কোনো সভা-সমাবেশ করা যাবে না। তাই আচরণবিধির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে শুক্রবারের কর্মসূচি পিছিয়ে শনিবার বিকেল সাড়ে চারটায় নির্ধারণ করা হয়েছে।’
জামায়াত প্রার্থীর অভিযোগের বিষয়ে বিএনপির প্রার্থী মির্জা ফয়সল আমীন বলেন, ‘শুরু থেকে এই আসনের উপনির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ করে জাতীয় ইস্যু তৈরি একটা ষড়যন্ত্র করে আসছিল জামায়াত। এই ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবে দাঁড়িপাল্লার প্রার্থীসহ কেন্দ্রীয় নেতারা এখানে প্রচারণায় আসার পাশাপাশি ঢাকায় বসেও উসকানিমূলক বক্তব্য দিয়ে গেছেন। এসব অভিযোগ আসলে সেই ষড়যন্ত্রেরই অংশ।’
অন্যদিকে উপনির্বাচনের রিটার্নিং কর্মকর্তা ও জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা কামরুল ইসলাম বলেন, বিভিন্ন পর্যায়ের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য, প্রশাসনের কর্মকর্তা, বিচারিক ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটরা মাঠে তৎপর ছিলেন। বিচ্ছিন্ন কিছু ঘটনা ঘটলেও উল্লেখ করার মতো কোথাও কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি।
উল্লেখ্য, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঠাকুরগাঁও-১ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। পরে তিনি রাষ্ট্রপতির শপথ নেওয়ায় আসনটি শূন্য ঘোষণা করা হয়। আসনটির উপনির্বাচনে পাঁচজন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। বাকি তিন প্রার্থী হলেন ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের খাদেমুল ইসলাম, বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলনের আবদুল আলীম নিজামী এবং বাংলাদেশ কংগ্রেসের হুসাইন মুহাম্মদ ওমর ফারুক।