
সামরুল হক, জামালপুর প্রতিনিধি:
জামালপুর জেলার দেওয়ানগঞ্জ উপজেলায় ষষ্ঠ উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান পদে বিজয়ী তৃতীয় লিঙ্গের প্রতিনিধি মোছা. মুন্নী আক্তার পদ পুনর্বহালের দাবিতে আবেগঘন সংবাদ সম্মেলন করেছেন। কণ্ঠরুদ্ধ ও অশ্রুসিক্ত অবস্থায় তিনি সরকারের কাছে তার নির্বাচিত পদ ফিরিয়ে দেওয়ার আহ্বান জানান।
সোমবার (২ মার্চ) পৌর শহরের চুনিয়াপাড়া এলাকায় হিজড়া সম্প্রদায়ের অস্থায়ী আবাসনে আয়োজিত এ সংবাদ সম্মেলনে তৃতীয় লিঙ্গের অর্ধশতাধিক সদস্য ও স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন। পুরো অনুষ্ঠানজুড়ে ছিল আবেগঘন পরিবেশ।
নির্বাচিত হয়েও দায়িত্ব পালন করতে পারেননি;
মুন্নী আক্তার বলেন, “আমি পাঁচজন নারী প্রার্থীকে পরাজিত করে প্রায় ২৪ হাজার ভোটে বিজয়ী হয়েছিলাম। সাধারণ মানুষ, বিশেষ করে গরিব, দুঃখী ও অবহেলিত জনগোষ্ঠী আমাকে তাদের প্রতিনিধি হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন। কিন্তু নির্বাচিত হওয়ার দুই-আড়াই মাসের মধ্যেই অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের এক অধ্যাদেশের মাধ্যমে আমাকে পদ থেকে অপসারণ করা হয়।”
তিনি জানান, নির্বাচনের সময় তিনি এলাকার উন্নয়ন, নারীর ক্ষমতায়ন এবং তৃতীয় লিঙ্গের মানুষের অধিকার রক্ষায় কাজ করার অঙ্গীকার করেছিলেন। কিন্তু দায়িত্ব থেকে অপসারণ হওয়ায় তিনি জনগণের প্রত্যাশা পূরণ করতে পারছেন না।
জনগণের ফোনে কষ্ট বাড়ছে:
সংবাদ সম্মেলনে কাঁদতে কাঁদতে মুন্নী বলেন,
“গ্রামের সহজ-সরল মানুষ সরকারি প্রজ্ঞাপন বোঝেন না। তারা এখনও আমাকে তাদের নির্বাচিত মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান মনে করে ফোন করেন, তাদের দুঃখ-কষ্ট, রাস্তা-ঘাটের সমস্যা, ভাতা সংক্রান্ত জটিলতার কথা বলেন। কিন্তু আমি কিছুই করতে পারছি না। এটা আমার জন্য খুবই কষ্টের।”
তিনি দাবি করেন, একজন নির্বাচিত প্রতিনিধিকে প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে অপসারণ করা গণতান্ত্রিক চেতনার পরিপন্থী।
সরকারের প্রতি দাবি;
বর্তমান সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে মুন্নী আক্তার বলেন,
“বর্তমান নির্বাচিত সরকার চাইলে আগের সরকারের জারি করা অধ্যাদেশ বাতিল করতে পারে। আমি সরকারের কাছে অনুরোধ করছি—জনগণের ভোটে নির্বাচিত প্রতিনিধি হিসেবে আমাকে পুনর্বহাল করা হোক। তৃতীয় লিঙ্গের একজন প্রতিনিধি হিসেবে এটি শুধু আমার ব্যক্তিগত বিষয় নয়, এটি আমাদের
সম্প্রদায়ের মর্যাদার প্রশ্ন।”
নির্বাচন ও অপসারণের প্রেক্ষাপট
উল্লেখ্য, ২০২৪ সালের ২১ মে ষষ্ঠ উপজেলা পরিষদ নির্বাচনের দ্বিতীয় ধাপে দেওয়ানগঞ্জ উপজেলা পরিষদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এতে ‘সেলাই মেশিন’ প্রতীকে মোছা. মুন্নী আক্তার ২৩ হাজার ৭৬৮ ভোট পেয়ে মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান পদে বিজয়ী হন।
পরবর্তীতে ৫ আগস্ট গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে তৎকালীন শেখ হাসিনা সরকারের পতন হলে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠিত হয়। এরপর ১৯ আগস্ট জারি করা প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে সারাদেশের উপজেলা পরিষদের নির্বাচিত চেয়ারম্যান ও ভাইস চেয়ারম্যানদের অপসারণ করা হয়।
তৃতীয় লিঙ্গের প্রতিনিধিত্বের প্রতীক;
স্থানীয়রা মনে করছেন, মুন্নী আক্তারের বিজয় ছিল তৃতীয় লিঙ্গের মানুষের জন্য এক গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। সমাজের মূলধারায় তাদের অংশগ্রহণ ও নেতৃত্বের ক্ষেত্রে এটি ইতিবাচক বার্তা বহন করেছিল। তার অপসারণে সেই সম্প্রদায়ের মাঝে হতাশা তৈরি হয়েছে বলেও জানান উপস্থিত অনেকে।
সংবাদ সম্মেলনে বক্তারা বলেন, “জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচিত একজন প্রতিনিধিকে দায়িত্ব পালনের সুযোগ দেওয়া উচিত। গণতন্ত্রে জনগণের রায়ই চূড়ান্ত।”
তৃতীয় লিঙ্গের একজন নির্বাচিত জনপ্রতিনিধির পদ পুনর্বহালের দাবি এখন স্থানীয়ভাবে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে সরকারের পক্ষ থেকে কী সিদ্ধান্ত আসে, সেটিই এখন সবার অপেক্ষা।
মন্তব্য করুন