
খুলনা প্রতিনিধি……
খুলনার প্রধান সরকারি চিকিৎসাকেন্দ্র খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি রোগীদের জন্য বরাদ্দকৃত খাদ্য সরবরাহে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ আবারও সামনে এসেছে। প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১৩০০ থেকে ১৬০০ রোগীর জন্য খাবার প্রস্তুতের কথা থাকলেও বাস্তবে নির্ধারিত মান ও পরিমাণ রক্ষা করা হচ্ছে না—এমন অভিযোগ দীর্ঘদিনের। নিম্নমানের চাল, ওজনে কম মাংস ও মাছ সরবরাহ এবং রান্না করা খাবার বাইরে বিক্রির ঘটনায় হাসপাতালের খাদ্য ব্যবস্থাপনা নিয়ে জনমনে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
হাসপাতালের নির্ধারিত খাদ্যতালিকা অনুযায়ী সকালে পাউরুটি, ডিম ও কলা এবং দুপুর ও রাতে ভাতের সঙ্গে ব্রয়লার মুরগি বা মাছ দেওয়ার কথা। সংশ্লিষ্ট নীতিমালায় উল্লেখ রয়েছে, মুরগির মাংসের প্রতিটি পিসের ওজন ১০০ গ্রাম হতে হবে এবং মাছ মাথা-লেজ ও নাড়িভুঁড়ি বাদ দিয়ে এক কেজি ওজনের হওয়ার কথা। এছাড়া উন্নতমানের চিকন চাল, মানসম্মত তেল-মসলা ব্যবহার এবং স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশে রান্না বাধ্যতামূলক। তবে অভিযোগ উঠেছে, এসব নির্দেশনা বাস্তবে মানা হচ্ছে না; বরং চিকন চালের পরিবর্তে মোটা ও নিম্নমানের চাল ব্যবহার এবং নির্ধারিত ওজনের চেয়ে কম মাংস-মাছ সরবরাহ করা হচ্ছে।
কিছুদিন আগে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) হাসপাতালের রান্নাঘরে অভিযান চালায়। সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, অভিযানে রোগীদের জন্য প্রস্তুতকৃত খাবারের মান ও পরিমাণে গরমিল, নিম্নমানের চাল ব্যবহার এবং অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে রান্নার প্রাথমিক সত্যতা পাওয়া যায়। এ ঘটনায় খাবার ঘরের দায়িত্বে থাকা স্টুয়ার্ড মোঃ হাবিব ও সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারের বিরুদ্ধে আইনানুগ পদক্ষেপ নেওয়া হয় বলে জানা যায়। অভিযানের পর স্টুয়ার্ডকে সাময়িকভাবে দায়িত্ব থেকে সরানো হলেও পরবর্তীতে তিনি পুনরায় স্বপদে বহাল হন—এ নিয়ে বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন উঠেছে, যদিও এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি।
এরই মধ্যে সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওতে হাসপাতালের রান্নাঘর থেকে রান্না করা মুরগির মাংস ও অন্যান্য খাদ্যসামগ্রী বাইরে পাচারের অভিযোগ নতুন করে বিতর্ক উসকে দেয়। ভিডিওটির সত্যতা যাচাই ও দায়ীদের চিহ্নিত করতে প্রশাসনিক তদন্তের দাবি উঠেছে।
অভিযোগের বিষয়ে স্টুয়ার্ড মোঃ হাবিব বলেন, রান্নাঘরে কর্মরত কিছু কর্মচারী দীর্ঘদিন বেতন না পাওয়ায় তারা খাবার নিয়ে যান। মুরগির মাংসের ওজন প্রসঙ্গে তিনি দাবি করেন যে পরিমাণ ঠিক আছে; তবে মাছ সরবরাহের ক্ষেত্রে সব সময় এক কেজি ওজন বজায় রাখা সম্ভব হয় না এবং কখনো কখনো ৭০০–৮০০ গ্রামের মাছও সরবরাহ করা হয় বলে তিনি উল্লেখ করেন। চিকন চালের পরিবর্তে মোটা চাল ব্যবহারের বিষয়ে তিনি বলেন, চিকন চাল রান্নায় সমস্যা হওয়ায় মোটা চাল ব্যবহার করা হয়।
হাসপাতালের পরিচালক আইনুল ইসলাম এ বিষয়ে বলেন, রোগীদের খাবার বাইরে পাচারের বিষয়টি অত্যন্ত দুঃখজনক এবং কোনোভাবেই সমর্থনযোগ্য নয়। তিনি তদন্ত সাপেক্ষে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের আশ্বাস দেন।
সরকারি হাসপাতালে ভর্তি রোগীদের জন্য পুষ্টিকর ও মানসম্মত খাদ্য নিশ্চিত করা চিকিৎসা ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। বরাদ্দকৃত খাদ্যের মান ও পরিমাণে অনিয়ম শুধু আর্থিক দুর্নীতির প্রশ্নই তোলে না, বরং রোগীর সুস্থতার সঙ্গেও সরাসরি সম্পৃক্ত। দুদকের পূর্ববর্তী অভিযান, সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল ভিডিও এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বক্তব্য মিলিয়ে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের খাদ্য ব্যবস্থাপনা নিয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ ও স্বচ্ছ তদন্ত এখন সময়ের দাবি বলে মনে করছেন সচেতন মহল।
মন্তব্য করুন