গাজীপুর প্রতিনিধি: গাজীপুরের গাছায় ঝুট ব্যবসাকে কেন্দ্র করে বিএনপির দুই পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ, ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া ও হামলার ঘটনায় এলাকায় উত্তেজনা বিরাজ করছে। এ ঘটনায় দৈনিক প্রতিদিনের কাগজের প্রতিনিধি টুটুল আহত হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন। পরে তিনি গাছা থানায় নয়জনকে আসামি করে মামলা করেছেন। তবে মামলায় বিএনপি নেতা ও স্থানীয় কয়েকজনকে আসামি করায় তা নিয়ে পাল্টাপাল্টি অভিযোগ উঠেছে।
স্থানীয় সূত্র ও সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, গাছা থানাধীন ডেকেরচালা রোডের ইনডেসোর সোয়েটার কারখানার সঙ্গে চুক্তিভিত্তিক ঝুট ব্যবসা করে আসছেন গাজীপুর সিটি করপোরেশনের ৩২ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি মো. হামিদ মন্ডল। গত ১৩ আগস্ট কারখানা থেকে ঝুট নেওয়ার সময় স্থানীয় বিএনপি নেতা মো. কালামের লোকজন ঝুট বহনকারী ট্রাকটি নেওয়ার চেষ্টা করেন বলে হামিদ মন্ডলের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়েছে।
এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে দুই পক্ষের মধ্যে দিনভর ধাওয়া-পাল্টাধাওয়ার ঘটনা ঘটে। একপর্যায়ে সংঘর্ষের মধ্যে সাংবাদিক টুটুল আহত হন। প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, ঘটনাস্থলে সাংবাদিক পরিচয় নিয়ে এক ব্যক্তির সঙ্গে টুটুলের কথা কাটাকাটি হয়। পরে একজন অজ্ঞাত ব্যক্তি তাকে আঘাত করে সেখান থেকে পালিয়ে যায় বলে স্থানীয় সূত্রের দাবি।
আহত টুটুলকে প্রথমে স্থানীয় একটি ফার্মেসিতে নেওয়া হয়। পরে উপস্থিত সাংবাদিকরা তাকে গাজীপুর শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যান। এ সময় হামিদ মন্ডল ও তার ছেলে সোহেলও টুটুলকে চিকিৎসার জন্য সহযোগিতা করেন বলে তাদের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে।
হামিদ মন্ডলের অভিযোগ, একই দিন বিকেল ৪টার দিকে মো. কালাম, আব্দুল মান্নান ও মিন্টু সরকারসহ শতাধিক লোক তার বাড়ি, দোকান ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে হামলা ও ভাঙচুর চালায়। এ সময় রাস্তা ও দোকানে থাকা সিসিটিভি ক্যামেরাও ভাঙচুর করা হয় বলে দাবি করেন তিনি। হামলার ঘটনার সিসিটিভি ফুটেজ সংরক্ষিত আছে বলেও জানান হামিদ মন্ডলের পক্ষের লোকজন।
অন্যদিকে সাংবাদিক টুটুলের করা মামলায় হামিদ মন্ডলকে প্রধান আসামি করা হয়েছে। মামলায় নয়জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। হামিদ মন্ডল অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, তার বৈধ চুক্তিভিত্তিক ঝুট ব্যবসা দখলের চেষ্টা থেকেই বিরোধের সূত্রপাত। সাংবাদিক টুটুলকে হামলার সঙ্গে তিনি বা তার ছেলে জড়িত নন বলেও দাবি করেন তিনি।
হামিদ মন্ডলের ভাষ্য, টুটুল আহত হওয়ার পর তিনি ও তার ছেলে সোহেলসহ উপস্থিত লোকজন তাকে নিরাপত্তা দেন এবং চিকিৎসার ব্যবস্থা করেন। সাংবাদিকের চিকিৎসায় সহযোগিতা করার পাশাপাশি হামলাকারীদের সিসিটিভি ফুটেজের মাধ্যমে শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনার আশ্বাসও দিয়েছিলেন বলে দাবি করেন তিনি।
তার দাবি, আসন্ন সিটি করপোরেশন নির্বাচনে ৩২ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর পদে নির্বাচন করার ইচ্ছা প্রকাশ করায় একটি মহল তার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছে। ঝুট ব্যবসা দখলের চেষ্টার অংশ হিসেবেই তাকে ও তার ছেলেসহ অন্যদের মামলায় জড়ানো হয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।
মামলার ৯ নম্বর আসামি মো. আলমাস খানও অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, সাংবাদিক টুটুলের ওপর হামলার সময় তিনি ঘটনাস্থল থেকে প্রায় ৫০০ মিটার দূরে ছিলেন। চিৎকার শুনে ঘটনাস্থলে গিয়ে টুটুলকে আহত অবস্থায় দেখতে পান। পরে তাকে চিকিৎসার জন্য স্থানীয় ফার্মেসিতে নেওয়ার পাশাপাশি হাসপাতালে নেওয়ার সময়ও তিনি সঙ্গে ছিলেন বলে দাবি করেন আলমাস খান।
আলমাস খান বলেন, আহত সাংবাদিকের চিকিৎসা ও খোঁজখবর নেওয়ার পরও তাকে হামলার মামলায় আসামি করা হয়েছে। ঘটনাটির সুষ্ঠু তদন্ত করে প্রকৃত হামলাকারীদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনার দাবি জানান তিনি।
এদিকে স্থানীয় সাংবাদিকদের কয়েকজনের দাবি, সংঘর্ষের সময় ঘটনাস্থলে সাংবাদিক টুটুলের গলায় কোনো পরিচয়পত্র ছিল না। সাংবাদিক পরিচয় নিয়ে এক ব্যক্তির সঙ্গে তার কথা কাটাকাটির পর হামলার ঘটনা ঘটে বলে তারা জানান। তবে হামলাকারী কে—তা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি বলেও তাদের দাবি।
এবং তারা আরো বলেন সাংবাদিকদের উপর হামলা ও মব সৃষ্টিকারীদের অতি দ্রুত সনাক্ত করে আইনের আওতায় আন দাবি জানান।
গাছা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. গোলাম রাব্বানী বলেন, গত ১৩ আগস্ট ঘটনার খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে থানা পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা করে। এ ঘটনায় যারা জড়িত, তদন্তের মাধ্যমে তাদের শনাক্ত করা হবে এবং জড়িতদের সবাইকে আইনের আওতায় আনা হবে।
সাংবাদিকের ওপর হামলার ঘটনায় বিভিন্ন সাংবাদিক ও সাংবাদিক সংগঠনের পক্ষ থেকে নিন্দা ও প্রতিবাদ জানানো হয়েছে। একই সঙ্গে প্রকৃত হামলাকারীদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনার দাবি উঠেছে।
দুই পক্ষের পাল্টাপাল্টি অভিযোগ থাকায় নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে সংঘর্ষের প্রকৃত কারণ, সাংবাদিকের ওপর হামলাকারী এবং মামলায় আসামিদের সংশ্লিষ্টতা যাচাইয়ের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় সাংবাদিকরা।