
সৌদি আরবে অবস্থান করে ফাজিল পাস ,সংবাদ প্রকাশের পর ফলাফল স্থগিত করল ইসলামি আরবি বিশ্ববিদ্যালয়
পরীক্ষায় অংশ না নিয়েও ‘পাস’—তদন্তে নেমেছে কর্তৃপক্ষ
সামরুল হক, জামালপুর প্রতিনিধি:
পরীক্ষায় অংশগ্রহণ না করেও ফাজিল পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার অভিযোগে গণমাধ্যমে ধারাবাহিক প্রতিবেদন প্রকাশের পর অবশেষে সংশ্লিষ্ট পরীক্ষার্থীর ফলাফল স্থগিত (Withheld) করেছে ইসলামি আরবি বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। ঘটনাটি শিক্ষা অঙ্গনে ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেছে এবং পরীক্ষা ব্যবস্থাপনা ও ফলাফল প্রক্রিয়াকরণ নিয়ে নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।
অভিযোগের সূত্রপাত:
জানা যায়, ২০২৫ সালের ২৭ নভেম্বর ইসলামি স্টাডিজ (বিষয় কোড–৪১৬) পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। অভিযোগ রয়েছে, ওই সময় বকশীগঞ্জ উপজেলার বাট্টাজোড় ইউনিয়নের ফুলদহপাড়া গ্রামের বাসিন্দা মনজুরুল হকের ছেলে মোস্তাকিম বিল্লাহ সৌদি আরবে অবস্থান করছিলেন। সংশ্লিষ্ট সূত্র ও মাদরাসা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, বিদেশে অবস্থানের কারণে তিনি পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করেননি।
কিন্তু ফলাফল প্রকাশের পর দেখা যায়—
শিক্ষাবর্ষ: ২০২১–২০২২
বর্ষ: ৩য় বর্ষ (ফাজিল)
রেজিস্ট্রেশন নম্বর: ২১২০৩১১৯১
ফাজিল রোল: ২১২০৩১১৯১
জিপিএ: ৩.২৫
ইসলামি স্টাডিজ (৪১৬) বিষয়ে গ্রেড: “বি”
পরীক্ষায় অংশ না নিয়েও কীভাবে একজন শিক্ষার্থী জিপিএ ৩.২৫ পেয়ে উত্তীর্ণ হলো—এ প্রশ্ন সামনে আসতেই বিষয়টি নিয়ে গণমাধ্যমে তথ্যভিত্তিক ধারাবাহিক প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। এরপর বিষয়টি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের নজরে আসে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের পদক্ষেপ:
প্রাথমিক অনুসন্ধানের অংশ হিসেবে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ সংশ্লিষ্ট কাগজপত্র তলব করে। পরবর্তীতে অনিয়মের প্রাথমিক সত্যতা পাওয়ায় পরীক্ষার্থীর ফলাফল স্থগিত করা হয়। বর্তমানে অনলাইন ফলাফলে তার নামের পাশে “Withheld” মন্তব্য দেখা যাচ্ছে এবং সংশ্লিষ্ট বিষয়ের গ্রেড কলাম ফাঁকা রাখা হয়েছে।
(১৬ ফেব্রুয়ারি) দুপুরে ইসলামি আরবি বিশ্ববিদ্যালয়-এর সহকারী পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক (ফাজিল পাস) এস. এম. সাদেকুর রহমান বলেন,
“বিষয়টি জানার পর বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের নির্দেশে ফলাফল স্থগিত করা হয়েছে। তদন্ত প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। তদন্ত শেষে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”
পরীক্ষার্থীর বক্তব্য:
এ বিষয়ে মোস্তাকিম বিল্লাহ বলেন,
“আমার পরীক্ষার ফলাফল কেন এমন করা হচ্ছে তা আমি জানি না। আমি পাশ করেছি—এটাই জানি। ফলাফল পরিবর্তনের বিষয়ে আমি অবগত নই।”
তার এই বক্তব্য নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে—পরীক্ষায় অংশগ্রহণ না করলে কীভাবে ফলাফলে গ্রেড যুক্ত হলো?
মাদরাসা কর্তৃপক্ষের প্রতিক্রিয়া:
বাট্টাজোড় কেরামতিয়া রিয়াজুল ইসলাম মাদরাসার অধ্যক্ষ মো. সুলতান মাহমুদ খসরু বলেন,
“মোস্তাকিম বিল্লাহ পরীক্ষার দিন সৌদি আরবে অবস্থান করছিলেন—এটি সঠিক। বিদেশে থাকায় তিনি পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করেননি। কিন্তু ফলাফলে সে কীভাবে পাশ করলো, তা আমার জানা নেই।”
তিনি বিষয়টিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ত্রুটি হিসেবে উল্লেখ করেন। তবে বিশ্ববিদ্যালয় সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিষয়টি কেবল ‘ত্রুটি’ নাকি পরিকল্পিত অনিয়ম—তা তদন্তেই স্পষ্ট হবে।
দায় এড়ানোর পাল্টাপাল্টি অবস্থান:
ঘটনাটি প্রকাশ্যে আসার পর মাদরাসা ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের মধ্যে দায় এড়ানোর প্রবণতা লক্ষ্য করা গেছে। একপক্ষ প্রশাসনিক ত্রুটির কথা বললেও অন্যপক্ষ বলছে, বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে এবং প্রয়োজন হলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তদন্ত ও সম্ভাব্য ব্যবস্থা:
বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা গেছে,
পরীক্ষায় অংশগ্রহণের উপস্থিতি তালিকা যাচাই করা হচ্ছে।
সংশ্লিষ্ট পরীক্ষা কেন্দ্রের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হতে পারে।
ফলাফল প্রক্রিয়াকরণে কারও অবহেলা বা জালিয়াতির প্রমাণ মিললে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সংশ্লিষ্ট মহলের মতে, যদি অভিযোগ সত্য প্রমাণিত হয়, তবে এটি শুধু একটি ব্যক্তিগত অনিয়ম নয়—বরং পরীক্ষা ব্যবস্থাপনার স্বচ্ছতা ও বিশ্বাসযোগ্যতার জন্য বড় ধরনের হুমকি।
শিক্ষা ব্যবস্থায় স্বচ্ছতার প্রশ্ন:
ঘটনাটি স্থানীয়ভাবে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। সচেতন মহল বলছেন, এমন ঘটনা শিক্ষাব্যবস্থার ওপর আস্থা নষ্ট করতে পারে। তাই দ্রুত, নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা উদঘাটন এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।
এখন সবার দৃষ্টি তদন্তের ফলাফলের দিকে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের পরবর্তী পদক্ষেপই নির্ধারণ করবে—এটি কেবল প্রশাসনিক ত্রুটি, নাকি পরিকল্পিত অনিয়মের একটি
মন্তব্য করুন