
আল মাহফুজ ,দেশভাগের আগের সময়। আসি আসি করছে ‘পঞ্চাশের মন্বন্তর’। ঢাকা শহরে তখন প্রায়ই দাঙ্গা লেগে থাকে। মানুষের জীবন যেন তখন চায়ের কাপের ছাই। তাদের বাঁচামরা নিয়ে অনেক রাজনীতিবিদ ভাবলেন না, তারা মেতে উঠলেন ধর্মের কার্ড নিয়ে। বামপন্থীরা সংখ্যায় কম হলেও দাঙ্গা থামাতে প্রধান ভূমিকা পালন করতে সচেষ্ট থাকেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ তীব্র হয়ে ওঠে। ‘দলিত-মুসলিম ঐক্য’ গড়ে তোলার লক্ষ্যে মুসলিম লীগে ভিড়ে যান ‘অস্পৃশ্য’ নেতা যোগেন মণ্ডল। আর সোমেন? সোমেন তখন গল্প লেখেন। তার গল্পে উঠে আসে জনহীন রাস্তার ভয়াবহতা, উঠে আসে গণমানুষের কথা।
৮ মার্চ ১৯৪২ সাল। সোমেন চন্দ তখন ইস্ট বেঙ্গল রেল শ্রমিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক। সেদিন ঢাকার সূত্রাপুরে ‘ফ্যাসিস্টবিরোধী’ এক সম্মেলনের আয়োজন করা হয়েছিল। সোমেন ছিলেন আয়োজকদের একজন। তিনি রেলওয়ে কর্মীদের একটি মিছিলে নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন। সূত্রাপুর সেবাশ্রমের কাছে ফ্যাসিস্ট চক্রের ভাড়াটে গুন্ডারা তার ওপর গুলি চালায় বলে ধারণা করা হয়। শুধু গুলি করেই তারা ক্ষান্ত থাকেনি, ভোজালি দিয়ে তার পেট চেরা হয় এবং ছুরি দিয়ে জিব কাটা হয়। রাস্তার ওপরেই তার নির্মম মৃত্যু ঘটে। সোমেন চন্দ মাত্র বাইশ বছর বয়সে মারা গেলেন। মাত্র বাইশ বছর!
ততোদিনে তিনি ‘ইঁদুর’ নামক বিখ্যাত গল্পটি লিখে ফেলেছেন। অনেকেই বাংলাদেশের প্রথম সার্থক ছোটগল্প হিসেবে গল্পটির নাম উল্লেখ করেন। পরবর্তীতে প্রকাশিত ‘সংকেত ও অন্যান্য গল্প’ বইখানাতে পাওয়া যায় তার অন্যান্য শক্তিশালী গল্প– ‘স্বপ্ন’, ‘সংকেত’, ‘দাঙ্গা’ প্রভৃতি।
‘দাঙ্গা’ গল্পের নায়ক অশোক। কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য। গল্পের শুরুতেই মরুভূমির মতো শূন্য আতঙ্কিত এক শহরের ছবি আছে। ছুরিকাহত মানুষের মতো মোটরগাড়ির ছুটে যাওয়া আছে। বাইরে দাঙ্গা চলছে আর বাড়ির ভেতরে আশোক উত্তপ্ত স্বরে ছোট ভাই অজয়কে বলছে–‘ফ্যাসিস্ট এজেন্ট। আজ বাদে কাল যখন ‘হিন্দু-মুসলমান ভাইবোনেরা’ বলে হাঁক ছাড়বি, তখন তোর গাধার মতো ডাক শুনবে কে? পেট মোটা হবে কার? জানিস, দাঙ্গা কেন হয়? জানিস, প্যালেস্টাইনের কথা? আয়ারল্যান্ডের কথা?’
‘দাঙ্গা’ এক মর্মান্তিক সত্য গল্প হলেও আমার মতে সোমেন চন্দের সেরা গল্প ‘বনস্পতি’। প্রকাণ্ড এক বটগাছ এই গল্পের প্রধান চরিত্র, যে দুইশ’ বছরের সামাজিক ও রাজনৈতিক ঘটনার সাক্ষী। একটি বনস্পতিকে লেখক যে ঢঙ্গে উপস্থাপন করেছেন কালের পরিক্রমায় ও জীবনের নানা নাটকীয়তার মধ্য দিয়ে, তা কেবলই অনন্য ও অতুলনীয়।সোমেন চন্দের বইয়ের প্রচ্ছদ এবং এপিটাফ
নন্দিত কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদ তার লেখায় সোমেন চন্দের প্রভাবের কথা অকপটে স্বীকার করেছেন। সোমেনের লেখা গল্পগুলো বাংলা সাহিত্যে মেঘে ঢাকা তারার মতো, বহু ভাষায় তা অনূদিত হয়েছে।
অনেকের মতে, সোমেন বাংলার ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনের প্রথম শহীদ। তিনিই বাংলা ভাষার প্রথম দিককার একজন সাহিত্যিক, যিনি দেখিয়েছিলেন রাজনীতিকে বাদ না দিয়েও মহৎ সাহিত্য হতে পারে। আর এ কারণেই তার গল্পে সাধারণ মানুষের বঞ্চনা এবং সেখান থেকে মুক্তির আকাঙ্ক্ষা প্রতিধ্বনিত হয়েছে।
বাংলায় গণসাহিত্য নিয়ে প্রথম গবেষণামূলক কাজ করেন সোমেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পদধ্বনি শুনে তিনি মানুষকে যুদ্ধবিরোধী শিবিরে ঐক্যবদ্ধ করার কাজে মনোযোগী হন। প্রগতি লেখক সংঘের মাধ্যমে অল্পদিনের মধ্যে আন্তর্জাতিক ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলন গড়ে তুলতে সক্ষম হন এই বিপ্লবী লেখক।
মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় সোমেন চন্দ সম্পর্কে লিখেছিলেন, ‘নিজস্ব একটি জীবনদর্শন না থাকলে সাহিত্যিক হওয়া যায় না। সোমেন চন্দ ছিল কমিউনিস্ট। সাহিত্যিক হিসেবেও তার রচনায় নানাভাবে ফুটে উঠেছে কমিউনিজমের জয়ধ্বনি।’
দুনিয়াজুড়েই এখন সমাজ পরিবর্তনকামী মানুষের দেখা মিলছে। এই সত্য স্পষ্ট যে, লড়াইয়ের কোনো বিকল্প নাই। লড়াই করেই দেখা মেলে পূবের আলোর। লড়াই শেষে হাসনুহেনায় শরীর মেখে যায়। সোমেন চন্দ যা বুঝেছিলেন অনেক আগেই।
লেখাটা শেষ করছি কথাশিল্পী জাকির তালুকদারের একটি মন্তব্য দিয়ে। সোমেন নিয়ে তিনি লিখেছেন–
‘অমর’ শব্দটি যথেচ্ছ ব্যবহারে তার ঔজ্জ্বল্য হারিয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশের উৎকৃষ্টতম ছোটগল্পের সংকলন করতে গেলে প্রথম যে লেখকের গল্পকে জায়গা করে দিতে হবে, তার নাম সোমেন চন্দ।
মন্তব্য করুন