অনলাইন ডেস্ক
১০ মার্চ ২০২৬, ৭:২০ পূর্বাহ্ন
অনলাইন সংস্করণ

দখল-দূষণে মুমূর্ষু গাছা খাল

গাজীপুর সদর ও গাছা থেকে টঙ্গীকে বিভক্ত করার সীমানা রেখায় অবস্থিত তুরাগ নদীর সংযোগ খাল। আঞ্চলিকভাবে  খালটিকে গাছা খাল, টঙ্গী খাল বা নিমতলী খালও বলা হয়।

১২.০৫ কিলোমিটার দীর্ঘ ঐতিহ্যবাহী প্রাচীন এই খালটি গাছা এলাকা থেকে উত্তরখাইলকুর বাঁকাব্রীজ, মইরান সেতু, বগারটেক সেতু, শুকুন্দিবাগ, গাজীপুরা, বনমালা, হায়দ্রাবাদ ও নিমতলী হয়ে তুরাগে মিশেছে। ১৯৮০ সালে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এই খাল খননের উদ্যোগ নিলেও পরে আর তা বাস্তবায়িত হয়নি।

সবশেষ অন্তর্বর্তীকালীন সরকার কাজ শুরু করার কথা বললেও শেষ পর্যন্ত তা হয়নি। তবে বর্তমান সরকার খালটি উদ্ধারের উদ্যোগ নিয়েছে বলে জানিয়েছেন পানিসম্পদ মন্ত্রী। 

অনুসন্ধানে জানা যায়, গাজীপুরের পৌনে ২০০ বছরের প্রাচীন গাছা খাল বাংলাদেশের ঐতিহাসিক ও প্রাকৃতিক ওয়াটার ওয়েজের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এটি কেবল পরিবেশগত দিক দিয়ে গুরুত্বপূর্ণ নয়, বরং স্থানীয় ইতিহাস ও জীবিকা- নির্ভরতার সঙ্গেও জড়িত।

এক সময় এটি গাজীপুর অঞ্চলের বিভিন্ন গ্রামকে নদী ও খালের মাধ্যমে সংযুক্ত করতো। খালটি প্রায়ই কৃষিভূমির পানি সরবরাহ এবং মাছ ধরা, নৌযান চলাচলের জন্য ব্যবহার করা হতো। 

ব্রিটিশ আমলে (১৮৫০-১৯৪৭) গাছা খাল আঞ্চলিক বাণিজ্য ও যোগাযোগের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। নদীপথের মাধ্যমে ধান, তুলা এবং অন্যান্য কৃষিপণ্য স্থানান্তরিত হতো এই খালের মাধ্যমে।

পরে স্বাধীনতার পর গাছা খালের গুরুত্ব কিছুটা কমে যায়। শহর সম্প্রসারণ, অবৈধ দখল এবং বর্জ্য ফেলার কারণে খালটি অনেকাংশে দূষিত ও সরু হয়ে পড়ে। তবে ১৯৮০ সালের এই খাল খননের উদ্যোগ নেন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান। তার মৃত্যুর পর উদ্যোগ বন্ধ হয়ে যায়। 

পরিবেশ ও স্থানীয় জীবিকা
গাছা খাল স্থানীয় জীববৈচিত্রের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

মাছ, পানিচর পাখি এবং অন্যান্য জলজ প্রাণীর আবাসস্থল হিসেবে এর যথেষ্ট পরিচিতি রয়েছে। একই সঙ্গে, স্থানীয় কৃষক ও মানুষদের সেচ এবং জল সরবরাহের জন্যও খালটি গুরুত্বপূর্ণ। 

খাল খননের উদ্যোগ
অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ২০২৫ সালে গাছা খাল উন্নয়নের উদ্যোগ নেয়। ২০২৫ সালের আগস্টে শুরু হয়ে ২০২৮ সালের জুনের মধ্যে কাজ শেষ করার কথা বলা হয়। কার্যাদেশে গত বছরের ৩০ অক্টোবর থেকে ২০২৭ সালের ২ জুনের মধ্যে খালটির উন্নয়ন, সৌন্দর্যবর্ধন ও পরিবেশ সংরক্ষণমূলক কাজ করতে ৮৩.৬২ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। পরিবেশ, বন ও জলবায়ূ পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের অধীনে বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তন ট্রাস্টের অর্থায়নে ও বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের বাস্তবায়নে এই কাজ শুরু হয়েছে বলা হলেও দৃশ্যত তেমন কিছু চোখে পড়েনি। এই অবস্থায় বর্তমান সরকারের আমলে  গত ৩ মার্চ পানিসম্পদ মন্ত্রী শহীদ উদ্দীন চৌধুরী এ্যানি খালটি পরিদর্শন করে খননের প্রতিশ্রতি দেন।

আরও পড়ুন  বরগুনায় যৌতুকের টাকার জন্য স্ত্রীকে অমানুষিক নির্যাতন, স্বামী খোকনের বিরুদ্ধে অভিযোগ

পরিদর্শনকালে উপস্থিত ছিলেন গাজীপুর-২ আসনের সংসদ সদস্য এম মঞ্জুরুল করিম রনি, গাজীপুর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মো. শওকত হোসেন সরকার, গাজীপুর মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার ইসরাইল হাওলাদার এবং গাজীপুর সিটি করপোরেশন ও এর সংশ্লিষ্ট দপ্তরের কর্মকর্তারা।

সরেজমিনেসোমবার সংশ্লিষ্ট এলাকায় গিয়ে জানা যায়, গাজীপুরের ঐতিহ্যবাহী এই খাল ক্রমেই বিলীন হওয়ার পথে। এর পাশের জমি দখল, আবর্জনা ফেলার কারণে এবং পর্যাপ্ত পরিচর্যার অভাবে খালটি সরু হয়ে যাচ্ছে। বিভিন্ন আবাসন কম্পানি ও স্থানীয় প্রভাবশালী মহল খালের তীর দখল করে গড়ে তুলেছেন  স্থাপনা। খালের দুই পাশে বসানো রয়েছে অসংখ্য দখলীয় সাইনবোর্ড।

এছাড়া কলকারখানার কালো বর্জ্য এই খাল দিয়ে প্রবাহিত হয়ে পরিবেশ দূষিত করছে। পাশাপাশি ময়লা আবর্জনা ফেলে খালের গতিপথ পরিবর্তন করে ফেলা হচ্ছে। ময়লার সঙ্গে ক্ষতিকর প্লাস্টিক পরিবেশকে মারাত্মক দূষিত করছে। খালের পচা পানি সেখানে ফেলা ময়লার দুর্গন্ধ বাতাসের সঙ্গে মিশে খালপাড়ের বাসিন্দাদের জীবন অতিষ্ঠ  করে তুলছে। খালের দূষিত জীবানু বাতাসের সঙ্গে মিশে মানুষের শরীরে নানা জটিল রোগ সৃষ্টি করছে।

স্থানীয় বাসিন্দা সাব্বির বলেন, এই খাল আমাদের শিশুদের খেলার জায়গা, কৃষিকাজ ও প্রাকৃতিক জলস্রোতের অন্যতম উৎস ছিল। খাল বিলীন হলে পরিবেশ ও জীবনযাত্রায় বড় ক্ষতি হবে। পরিবেশবিদরা সতর্ক করে বলছেন, অবিলম্বে খনন ও সংরক্ষণ কার্যক্রম শুরু না করলে আগামী কয়েক বছরের মধ্যে খালটি পুরোপুরি বিলীন হয়ে যাবে।

টঙ্গীর বনমালা এলাকার হোটেল মালিক ইসমাইল কালের কণ্ঠকে বলেন, খালটি প্রায় বিলীন হয়ে গেছে। রক্ষা না করলে আর পাওয়া যাবে না।

গাজীপুরা এলাকার বাসিন্দা ইসমত আরা বলেন, খালের পানির গন্ধ বিষাক্ত। এতে রোগ জীবানু ছড়াচ্ছে। প্রতিকার চাই আমরা।
এই অবস্থায় স্থানীয় নাগরিক কমিটি ও বিভিন্ন পরিবেশবাদী সংগঠন ইতোমধ্যেই খালের পুনঃখনন ও সংরক্ষণের জন্য অবিলম্বে উদ্যোগ নেওয়ার দাবি তুলেছে।

Facebook Comments Box

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

জাহাজ আটকের ঘটনায় যুক্তরাষ্ট্রের ‘অবৈধ ও বর্বর’ পদক্ষেপের জন্য জাতিসংঘে অভিযোগ ইরানের

ভাসানচরকে সন্দ্বীপের অন্তর্ভুক্ত করতে ভূমি মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে হাইকোর্টের রুল

শুরু হলো এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষা

তেল-গ্যাস সংকটে যেন কেউ সিন্ডিকেট করতে না পারে, তা নিশ্চিত করবে সরকার: রিজভী

কাল থেকে শুরু এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষা, অংশ নেবে সাড়ে ১৮ লাখ শিক্ষার্থী

পাচারকৃত অর্থ ফিরিয়ে এনে কৃষক-ফ্যামিলি কার্ডের মাধ্যমে জনগণকে দেওয়া হবে

সন্ধ্যার মধ্যে চার অঞ্চলে ৬০ কিমি বেগে বজ্রবৃষ্টির আভাস

বিগত স্বৈরাচার ও অন্তর্বর্তীকালীন সরকার বাচ্চাদের জন্য টিকা আনেনি: প্রধানমন্ত্রী

হাম ও হামের উপসর্গে আরও ৫ শিশুর মৃত্যু

দেশে এপ্রিল-মে মাসের পূর্ণ জ্বালানি সক্ষমতা রয়েছে: জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী

১০

রাশিয়ার জ্বালানি আমদানিতে বাংলাদেশকে আরও ৬০ দিনের ছাড় দিলো যুক্তরাষ্ট্র

১১

জামালপুরে কারাগারে আওয়ামী লীগ নেতার মৃত্যু

১২

জাতীয় সংকট উত্তরণে ঐক্যবদ্ধ হয়ে কাজ করার আহ্বান জামায়াত আমিরের

১৩

রাজধানীর গুলশানে সিসাবারে অভিযান, সেবন সামগ্রী জব্দ

১৪

শুক্রবার রাজধানীর যেসব মার্কেট বন্ধ থাকবে

১৫

ঐতিহাসিক মুজিবনগর দিবস আজ

১৬

সংরক্ষিত আসনের প্রার্থী বিএনপির শহিদ পরিবারের সদস্য ছাত্রদলের শারমিন সুলতানা রুমা

১৭

পহেলা বৈশাখ আমাদের জাতিসত্তার ইতিহাস, সংস্কৃতি ও আত্মপরিচয়ের এক অনন্য প্রতীক

১৮

মানবাধিকার কমিশনের সব সদস্যের পদত্যাগ

১৯

বিদ্যুতের দাম সমন্বয়ে মন্ত্রিসভা কমিটি গঠন

২০