ঢাকা    শুক্রবার, ০৭ আগস্ট ২০২৬, ২২ শ্রাবণ ১৪৩৩
Protidinkhabor.com

প্রেমের টানে এসে মৃত্যু, ৫ বছর ধরে রমেক মর্গে ভারতীয় নাগরিকের লাশ

প্রেমের টানে ভারত থেকে বাংলাদেশে বেড়াতে এসে অসুস্থজনিত কারণে মৃত্যু হয় হতভাগ্য প্রবীর মণ্ডলের। সেই থেকে লাশ দেশে ফিরিয়ে নিতে আইনি জটিলতার কারণে গত পাঁচ বছর পড়ে আছে রংপুর মেডিকেল কলেজ (রমেক) হাসপাতাল মর্গে। পুলিশ ও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, বিষয়টি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে ভারতীয় কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা হয়েছে। চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত না আসা পর্যন্ত লাশ হিমঘরেই রাখা হবে। প্রবীর মণ্ডল তিনি ভারতের পশ্চিমবঙ্গের উত্তর চব্বিশ পরগনা জেলার আলমবাজার এলাকার বাসিন্দা মহাদেব মণ্ডলের ছেলে। ২০২১ সালের ৮ নভেম্বর তার মৃত্যু হয়। সেই সময় তার বয়স ছিল ৪১ বছর। এ সম্পর্কে জানতে চাইলে লালমনিরহট পুলিশ সুপার মো আসাদুজ্জামান যুগান্তরকে জানিয়েছেন, প্রবীর মণ্ডলের পকেটে থাকা পাসপোর্ট অনুযায়ী তিনি ২০১৮ সালের ৩ মার্চ বেনাপোল ইমিগ্রেশন হয়ে ভ্রমণ ভিসায় বাংলাদেশে আসেন এবং একই বছরের ১৬ মার্চ ভারতে ফিরে যান। তবে এরপর তিনি পুনরায় কোনো প্রক্রিয়ায় বা কিভাবে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছিলেন, সে সংক্রান্ত কোনো বৈধ নথি বা সরকারি তথ্য পাওয়া যায়নি। তদন্তে জানা যায়, বাংলাদেশে অবস্থানকালে সীমান্তবর্তী লালমনিরহাটের পাটগ্রাম উপজেলার দহগ্রাম এলাকার এক নারীর সঙ্গে তার সম্পর্ক গড়ে ওঠে। ২০২১ সালের ৮ নভেম্বর ভারত থেকে এসে ওই নারীর বাড়িতে অসুস্থ হয়ে পড়লে প্রথমে তাকে পাটগ্রাম উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হয়। পরে উন্নত চিকিৎসার জন্য রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তর করা হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। ঘটনার পর পাটগ্রাম থানায় একটি অপমৃত্যু (ইউডি) মামলা দায়ের করা হয়। এ বিষয়ে পুলিশ সুপার পুলিশের হেড কোয়ার্টারে জানিয়ে পত্র দিয়েছেন। পুলিশ হেড কোয়ার্টার থেকে ভারতীয় হাইকমিশনার ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে পত্র দিয়ে জানিয়েছে। কিন্তু এ নিয়ে কোনো সিদ্ধান্ত এখনো পাওয়া যায়নি। তাই তার লাশ রমেক হাসপাতালের মর্গে সংরক্ষিত আছে। তিনি বিদেশি নাগরিক তাই পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও ভারতীয় হাইকমিশনার দপ্তরের মতামত ছাড়া কিছুই করার নেই। পাটগ্রাম থানার ওসি নাজমূল হক বলেন, প্রবীর মণ্ডলের পরিবারের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগ করা হয়েছে; কিন্তু তারা এখন পর্যন্ত লাশ নিতে আগ্রহ দেখায়নি। তারা দুই দেশের আইনি জটিলতা ও লাশ ফিরিয়ে নিতে আর্থিক ব্যয়ের কারণে কোনো যোগাযোগ করছেন না। তিনি বলেন, বিষয়টি পুলিশ সুপার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে জানিয়েছেন। সেখান থেকে সিদ্ধান্ত এলে পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। প্রবীরের ছোট ভাই সুবীর মণ্ডলের সঙ্গে এখনো যোগাযোগ রাখছি, কিন্তু তারা মরদেহ নিতে আগ্রহ দেখাচ্ছেন না তিনি। রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের হিমঘরের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা দুলাল বসুনিয়া বলেন, লাশটি এখনো হিমঘরে সংরক্ষিত রয়েছে। তিনি বলেন, ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশ পেলেই ধর্মীয় রীতিনীতি অনুযায়ী লাশের সৎকার বা হস্তান্তরের ব্যবস্থা করা হবে। আমরা শুধু সংরক্ষণের দায়িত্ব পালন করছি। রমেক হাসপাতালের উপ-পরিচালক ডা. আব্দুল মোকাদ্দেম বলেন, ২০২১ সালের ৮ নভেম্বর থেকে লাশটি হাসপাতালের হিমঘরে রয়েছে। এ নিয়ে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ একাধিকবার পুলিশ প্রশাসনকে জানিয়েছে কিন্তু আইনি জটিলতার কারণে কোনো সুরাহা হয়নি। তাই আমরা ওই লাশ সংরক্ষণ করছি। তার ভাষ্য, পুলিশের অনুরোধেই লাশ সংরক্ষণ করা হয়েছে। পুলিশ যখন প্রয়োজন মনে করবে, তখনই লাশ হস্তান্তর করা হবে। আমরা শুধু সংরক্ষণের দায়িত্বে আছি। তবে এত দীর্ঘ সময় ধরে একটি মরদেহ হিমঘরে পড়ে থাকা কোনোভাবেই কাম্য নয়। তিনি আরও জানান, এ বিষয়ে একাধিকবার স্থানীয় প্রশাসনকে চিঠি দেওয়া হয়েছে। তবে এখনো কোনো কার্যকর সমাধান হয়নি। চিকিৎসকদের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে প্রবীর মণ্ডলের মৃত্যু হয়েছিল। প্রবীর মণ্ডলের মৃত্যুর সময় বিশ্বজুড়ে করোনা মহামারির প্রভাব ছিল। সেই সময় সীমান্তে কঠোর বিধিনিষেধ থাকায় ভারতীয় কর্তৃপক্ষ সম্ভবত মরদেহ গ্রহণে আগ্রহী হয়নি।

প্রেমের টানে এসে মৃত্যু, ৫ বছর ধরে রমেক মর্গে ভারতীয় নাগরিকের লাশ