
এই হেডলাইনটির সত্যতা যাচাই করতে হলে আমাদের শুধু সমসাময়িক বাংলাদেশে তাকালেই হবে না। ইতিহাসের একটু গভীরে যেতে হবে। বিশেষ করে উনিশ শতকের শেষভাগে, স্বামী বিবেকানন্দের সময়ের সমাজচিত্রে।
ঊনবিংশ শতাব্দীর বাংলা ছিল জাগরণের যুগ বলে পরিচিত। শিক্ষা ছিল, সাহিত্য ছিল, বিতর্ক ছিল। কিন্তু স্বামী বিবেকানন্দ এই সমাজের ভেতরে একটি ভয়ংকর দুর্বলতা দেখেছিলেন। তিনি দেখেছিলেন এক ধরনের নৈতিক ক্লান্তি। অন্যায় চোখের সামনে ঘটছে, দারিদ্র্য মানুষকে পিষে ফেলছে, সমাজের নিচু তলায় মানুষ নিঃশেষ হয়ে যাচ্ছে, অথচ শিক্ষিত ও প্রভাবশালী শ্রেণি নির্বিকার। তারা দেখছে, বোঝে, আলোচনা করে, কিন্তু দাঁড়ায় না। ঝুঁকি নেয় না। প্রতিবাদ করে না।
স্বামী বিবেকানন্দ বারবার বলেছিলেন, কেবল জ্ঞান বা বুদ্ধিবৃত্তিক উৎকর্ষ সমাজকে বাঁচাতে পারে না যদি তার সঙ্গে চরিত্র, সাহস এবং দায়িত্ববোধ না থাকে। তিনি যে সময়ের কথা বলছিলেন, তখন উপনিবেশিক শাসন ছিল, শোষণ ছিল। কিন্তু তাঁর আক্ষেপ ছিল শুধু শাসকের বিরুদ্ধে নয়। তিনি ক্ষুব্ধ ছিলেন নিজের সমাজের সেই অংশের ওপর, যারা সব বোঝে অথচ চুপ থাকে। এই নীরবতাকেই তিনি সবচেয়ে বড় বিপদ বলে মনে করতেন, কারণ এটি অন্যায়কে স্বাভাবিক করে তোলে।
এখন সময়ের চাকা ঘুরে আমরা এসে দাঁড়িয়েছি আজকের বাংলাদেশে। শাসনব্যবস্থা বদলেছে, পতাকা বদলেছে, সংবিধান আছে, নির্বাচন আছে। কিন্তু একটি জিনিস আশ্চর্যভাবে অপরিবর্তিত রয়ে গেছে। সেই নীরবতা।
আজ আমরা প্রায়ই বলি, দেশ ধ্বংস হচ্ছে দুর্নীতির কারণে। নিঃসন্দেহে দুর্নীতি ভয়াবহ। এটি প্রতিষ্ঠান ভাঙে, আস্থা নষ্ট করে, বৈষম্য বাড়ায়। কিন্তু দুর্নীতির জন্ম কোথায়? দুর্নীতি টিকে থাকে কীভাবে? এখানে ফিরে আসে সেই পুরোনো প্রশ্ন। কে দেখছে আর কে চুপ করে আছে।
বাংলাদেশে দুর্নীতি একা কাজ করে না। এর পাশে দাঁড়িয়ে থাকে নীরবতা। প্রশাসনের ভেতরে কেউ জানে কিন্তু বলে না। বুদ্ধিজীবী সমাজ বোঝে কিন্তু নিরাপদ দূরত্বে থাকে। শিক্ষিত মধ্যবিত্ত ক্ষুব্ধ হয়, কিন্তু কেবল ঘরের ভেতরে। এই সম্মিলিত নীরবতাই দুর্নীতিকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেয়।
স্বামী বিবেকানন্দের সময় যেমন ছিল, আজও তেমনই একটি এলিট শ্রেণি আছে, যারা সমাজের বাস্তবতা বোঝে। পার্থক্য শুধু এই যে, আজ তাদের হাতে আরও বেশি তথ্য, আরও বেশি সুযোগ, আরও বেশি কণ্ঠস্বর। তবু তারা চুপ থাকে। এই চুপ থাকাই দুর্নীতিকে শক্তি দেয়।
তাই হেডলাইনে ফিরে এলে প্রশ্নটি নতুন করে ভাবতে হয়। দেশ ও জাতির ধ্বংসের জন্য কি কেবল দুর্নীতি দায়ী? নাকি দুর্নীতির চেয়েও বড় অপরাধ হলো সেই নীরবতা, যা অন্যায়কে চলতে দেয়, স্বাভাবিক করে তোলে, এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য এটিকে উত্তরাধিকার বানিয়ে যায়।
স্বামী বিবেকানন্দ আমাদের শিখিয়েছিলেন, সমাজ বদলায় তখনই যখন সচেতন মানুষ নৈতিক দায়িত্ব নেয়। ইতিহাস বলছে, অন্যায়ের চেয়ে ভয়ংকর হলো সেই সমাজ, যে অন্যায়কে দেখেও নিশ্চুপ থাকে। আজকের বাংলাদেশে দাঁড়িয়ে সেই সত্য আরও নির্মমভাবে স্পষ্ট।
এখন বাস্তব চিত্রে আসা যাক।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানে যারা জীবন দিলো, তাদের কথা আমরা কতটা সত্যিকার অর্থে স্মরণ করি। তাদের রক্তে রাজপথ রঞ্জিত হলো, তাদের সাহসে অন্তত এক মুহূর্তের জন্য হলেও ক্ষমতার অলিন্দে ভয় কেঁপে উঠেছিল। কিন্তু সময় গড়াতেই দৃশ্যপট বদলে গেল। যারা পঙ্গু হলো, যারা কোনোভাবে প্রাণ নিয়ে বেঁচে রইলো, তারা আজ কোথায়? রাষ্ট্র কি তাদের কাঁধে হাত রেখেছে? সমাজ কি তাদের পাশে দাঁড়িয়েছে? নাকি তারা ধীরে ধীরে পরিসংখ্যান হয়ে গেছে।
আরেকদিকে ছিল সেই মানুষগুলো, যারা স্বৈরাচারের ভয়ে পনেরো ষোলো বছর নিরাপদ আশ্রয়ে আত্মগোপনে ছিল। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তারা নিজেদের জীবন গুছিয়ে নিয়েছে। সুযোগ আসতেই তারা আবার সামনে এসেছে। পুরনো নেটওয়ার্ক, পুরনো সুবিধা, পুরনো ক্ষমতার বলয় সবই তারা আগের মতো করে সাজিয়ে নিয়েছে। রাষ্ট্র বদলালেও তাদের জীবনযাপন বদলায়নি।
কিন্তু সেই অভাগা বঞ্চিত মানুষের কী হলো? যারা একটু মাথা উঁচু করে বাঁচতে চেয়েছিল। যারা বলেছিল, আমরা আর চুপ থাকবো না। যারা অন্যায়ের নাম ধরে ডাকতে শুরু করেছিল। ঠিক তখনই তাদের কাঁধে চাপিয়ে দেওয়া হলো সাজানো মিথ্যার বোঝা। ধীরে ধীরে ভুলে যেতে শুরু করা হলো তাদের ঋণ। তার পাশাপাশি শুরু হলো অকৃতজ্ঞতার ছোবল, যা শুধু ভুলে যাওয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। ওসমান হাদির মতো একজন মহামানবকেও জীবন দিতে হয়েছে। প্রশ্নবিদ্ধ করা হলো তাদের চরিত্র। রুদ্ধ করে দেওয়া হলো তাদের কণ্ঠ। সমাজকে বোঝানো হলো, এরা সমস্যার উৎস। এরা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করছে।
এই প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েই নতুন স্বৈরশাসকের আনাগোনা শুরু হলো। চেহারা বদলালো, ভাষা বদলালো, কিন্তু চরিত্র বদলালো না। এ যেন নতুন বোতলে পুরনো মদ। পুরনো দমননীতি নতুন শব্দে ফিরে এলো। পুরনো ভয় নতুন যুক্তিতে প্রতিষ্ঠা পেল।
এই সবকিছু যখন ঘটছে, তখন সেই এলিট গোষ্ঠী কী করছে? তারা দেখছে। তারা শুনছে। তারা জানে। তারা বোঝে। তবু তারা নীরব। এই নীরবতা কোনো অসহায়ত্ব নয়। এটি একটি সচেতন পছন্দ। কারণ কথা বললে ঝুঁকি আছে। অবস্থান নিলে অস্বস্তি আছে। নীরব থাকলে সুবিধা অক্ষুণ্ণ থাকে।
ভাবুন, গণভোটে একটি হ্যাঁ ভোট দেওয়া কতটা সামান্য কাজ। সেটুকু করলেই একটি অবস্থান স্পষ্ট হয়। কিন্তু সেখানেও দেখবেন এই গোষ্ঠী হয় নিরপেক্ষ থাকবে, নয়তো নীরবতা পালন করবে। কারণ তাদের কাছে নৈতিক দায়িত্বের চেয়ে নিজের নিরাপত্তাই বড়।
আমার কথা যদি বিশ্বাস না হয়, তদন্ত করুন। বিশ্লেষণ করুন। ইতিহাস দেখুন। বর্তমানের ঘটনাগুলো পাশাপাশি রাখুন। ভাবুন, কারা লাভবান হচ্ছে। কারা হারাচ্ছে। ভাবুন কী করণীয়, আর কী বর্জনীয়।
দেশ ও জাতির ধ্বংস যদি শুধু দুর্নীতির কারণে হতো, তাহলে এত নীরব দর্শকের প্রয়োজন পড়তো না। সত্যিকারের বিপর্যয় ঘটে তখনই, যখন একটি সমাজ অন্যায় দেখে অভ্যস্ত হয়ে যায়। যখন এলিট শ্রেণি নৈতিক দায়িত্ব ছেড়ে নীরবতাকেই বেছে নেয়। তখন দুর্নীতি নয়, এই নির্লজ্জ নিষ্ঠুর নীরবতাই হয়ে ওঠে রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় শত্রু।
স্বামী বিবেকানন্দের শিক্ষা ছিল, জ্ঞান যথেষ্ট নয়; সাহসী হতে হবে, কাজ করতে হবে। আর ইমাম আলী (রা), ইসলামের চতুর্থ খলিফা ও ন্যায়পরায়ণতার প্রতীক, আমাদের শেখান যে অন্যায়ের বিরুদ্ধে যে দাঁড়ায় না, সে অনৈতিকতার অংশীদার। তিনি সর্বদা ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়িয়েছেন, নিজের নিরাপত্তা বা সুবিধার আশঙ্কা উপেক্ষা করে, এবং মানুষের প্রতি দায়িত্বকে সর্বোচ্চ মূল্য দিয়েছেন। সাহস ও নৈতিকতার সঙ্গে কাজ না করলে অন্যায় টিকে থাকে, এটাই তার শিক্ষার মূল কথা।
আজকের সমাজে এই বার্তা আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। শুধু দেখার বা বোঝার জন্য নয়; প্রত্যেকের দায়িত্ব নেওয়া প্রয়োজন। নীরবতা নয়, সাহসিকতা আমাদের একমাত্র শক্তি। অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোই মানবতার একমাত্র পথ, এবং এটি শুরু হয় আমাদের প্রত্যেকের ছোট কিন্তু দৃঢ় পদক্ষেপ থেকে।
রহমান মৃধা, গবেষক ও লেখক, সাবেক পরিচালক, ফাইজার, সুইডেন
মন্তব্য করুন