
বিশ্ব অর্থনীতির অস্থিরতা ও যুক্তরাষ্ট্রের সামগ্রিক আমদানি কমে যাওয়ার পরও ২০২৫ সালে দেশটিতে বাংলাদেশে পোশাক রপ্তানি বেড়েছে ১২ শতাংশের মতো। রপ্তানির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৮২০ কোটি ডলার, যা দেশীয় মুদ্রায় প্রায় ৯৮ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। এই রপ্তানি আয়ের ফলে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে পোশাক রপ্তানিতে বাংলাদেশের তৃতীয় অবস্থান অক্ষুণ্ন রয়েছে। তবে প্রধান রপ্তানিকারক দেশের মর্যাদা হারিয়েছে চীন। চীনকে টপকে ভিয়েতনাম এখন যুক্তরাষ্ট্রে শীর্ষ পোশাক রপ্তানিকারক দেশ। অন্যদিকে প্রথমবারের মতো দ্বিতীয় অবস্থানে নেমে গেছে চীন।
যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অধীন প্রতিষ্ঠান অফিস অব টেক্সটাইল অ্যান্ড অ্যাপারেলের (অটেক্সা) সর্বশেষ পরিসংখ্যান বলছে, ২০২৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রের মোট পোশাক আমদানি আগের বছরের তুলনায় ১ দশমিক ৭৪ শতাংশ কমেছে। বছর শেষে দেশটির মোট আমদানির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৭৭ দশমিক ৮৮ বিলিয়ন ডলার। আমদানির পরিমাণ কমেছে ৩ দশমিক ৭০ শতাংশ। অবশ্য পোশাকের গড় ইউনিট প্রতি মূল্য ২ দশমিক শূন্য ৩ শতাংশ বেড়েছে। যদিও পাল্টা শুল্কের প্রভাবে বছরের শেষ তিন মাসে মার্কিন বাজারে আমদানির গতি প্রত্যাশার চেয়ে বেশ ধীর ছিল। গত বছরের আগস্ট মাসে ২০ শতাংশ পাল্টা শুল্ক আরোপ হয়।
ওটেক্সার প্রতিবেদন বলছে, গত বছর যুক্তরাষ্ট্রে পোশাক রপ্তানিতে ভিয়েতনামের হিস্যা সবচেয়ে বেশি, ২১ দশমিক ৫০ শতাংশ। যুক্তরাষ্ট্রে দেশটির রপ্তানির পরিমাণ ছিল এক হাজার ৬৭৫ কোটি ডলার। দ্বিতীয় অবস্থানে নেমে যাওয়া চীন রপ্তানি করেছে এক হাজার ৬৪ কোটি ডলারের। তৃতীয় অবস্থানে থাকা বাংলাদেশের হিস্যা ছিল ১০ দশমিক ৫৩ শতাংশ। অন্যদিক ভারত ও কম্বোডিয়া যথাক্রমে চতুর্থ ও পঞ্চম অবস্থানে রয়েছে। এই দেশ দুটির রপ্তানির হিস্যা যথাক্রমে ৬ দশমিক ৩৫ ও ৬ দশমিক ২০ শতাংশ।
অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং পাল্টা শুল্ক আরোপের পরও বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় বাজার যুক্তরাষ্ট্রে এই রপ্তানিকে সন্তোষজনক বলছেন রপ্তানিকারকরা। জানতে চাইলে তৈরি পোশাক উৎপাদন ও রপ্তানিকারক উদ্যোক্তাদের সংগঠন বিজিএমইএর সাবেক পরিচালক ও ডেনিম এক্সপার্টের অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক মহিউদ্দিন রুবেল সমকালকে বলেন, সামগ্রিক মন্দাবস্থা সত্ত্বেও বাংলাদেশ থেকে আমদানির চিত্র ছিল বেশ আশাব্যঞ্জক। ২০২৫ সালে বাংলাদেশ থেকে যুক্তরাষ্ট্রের পোশাক আমদানি বেড়ে ৮ দশমিক ২০ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে, যা এখন পর্যন্ত দেশটিতে বাংলাদেশের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বার্ষিক রপ্তানি আয়। ২০২৪ সালের তুলনায় পোশাক রপ্তানি ১১ দশমিক ৭১ শতাংশ বেড়েছে। শুধু ২০২৫ সালের ডিসেম্বর মাসে বাংলাদেশ থেকে যুক্তরাষ্ট্রের পোশাক আমদানি আগের একই সময়ের তুলনায় ৩ দশমিক ৩৩ শতাংশ বেড়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের সামগ্রিক বাজারে বছরের দ্বিতীয়ার্ধে প্রবৃদ্ধি প্রথমার্ধের তুলনায় দুর্বল ছিল।
গত বছর যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে শুল্ক নিয়ে বেশ চড়াই উতরাই গেছে। গত বছরের ২ এপ্রিল যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বিভিন্ন দেশের পণ্যে পাল্টা শুল্ক আরোপের ঘোষণা দেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। বাংলাদেশের পণ্যে ৩৭ শতাংশ পাল্টা শুল্ক আরোপের কথা বলা হয়, যা কার্যকর হওয়ার কথা ছিল ৯ এপ্রিল। কার্যকরের দিন তিন মাসের জন্য তা স্থগিত হয়। ৯ জুলাই বাংলাদেশসহ ১৪ দেশের ওপর শুল্কহার পুনর্নির্ধারণ করেন ট্রাম্প। তখন বাংলাদেশের পণ্যে পাল্টা শুল্ক কমে ৩৫ শতাংশ হয়। ১ আগস্ট এই হার কার্যকর হওয়ার কথা ছিল। এর মধ্যে সরকারের সঙ্গে দফায় দফায় আলোচনায় ১ আগস্ট বাংলাদেশের পণ্যে পাল্টা শুল্ক ২০ শতাংশে নামিয়ে আনা হয়, যা ওই দিন থেকেই কার্যকর হয়। গত ১২ ফেব্রুয়ারি শুল্ক ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একটি চুক্তি করে সরকার। এতে শুল্ক কমে ১৯ শতাংশ হওয়ার কথা। এর মধ্যে গত ২০ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্ট পাল্টা শুল্ক কাঠামোকে বেআইনি ঘোষণা করে। ওই দিনই আবার অন্য আইনে প্রথমে ১০ এবং পরে ১৫ শতাংশ শুল্ক আরোপের ঘোষণা দেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। এখন পর্যন্ত ১০ শতাংশ হারে শুল্ক আদায় হচ্ছে।
মন্তব্য করুন