বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ও বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, বৈষম্যহীন, ন্যায়ভিত্তিক ও যুবসমাজের আকাঙ্ক্ষার বাংলাদেশ গড়তে তারা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
রবিবার (২৫ অক্টোবর) জাতীয় প্রেস ক্লাবের কাজী নজরুল ইসলাম মিলনায়তনে ‘জুলাই জাতীয় সনদ স্বাক্ষরের বর্ষপূর্তি’ উপলক্ষে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী আয়োজিত আলোচনা সভায় সভাপতির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন।
শফিকুর রহমান বলেন, দীর্ঘ ফ্যাসিবাদী শাসনের পর ২০২৪ সালে দেশে জুলাই বিপ্লব হয়। পরে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠিত হয়। জুলাইয়ের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নে ওই সরকার ঐকমত্য কমিশন গঠন করে। দেশি-বিদেশি বিশেষজ্ঞ ও রাজনৈতিক দলগুলোর অংশগ্রহণে সাত মাসের বেশি সময় আলোচনার পর বেশির ভাগ বিষয়ে ঐকমত্যের ভিত্তিতে একটি সনদ তৈরি হয়। সনদটি বাস্তবায়নের অঙ্গীকারের অংশ হিসেবে ২০২৫ সালে অংশীজনেরা এতে স্বাক্ষর করেন।
তিনি বলেন, একই দিনে জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট অনুষ্ঠিত হয়েছে। জামায়াতের দাবি ছিল, আগে গণভোট এবং পরে জাতীয় সংসদ নির্বাচন আয়োজন করা হোক। দুটি ভোট একসঙ্গে হলে বিষয়গুলো গুলিয়ে ফেলার আশঙ্কা ছিল, যা শেষ পর্যন্ত সত্যি হয়েছে বলে তিনি দাবি করেন। তার অভিযোগ, শুরু থেকেই চাতুর্যের আশ্রয় নেওয়া হয়েছে। বিএনপির দাবি ছিল দুটি ভোট একই দিনে আয়োজনের, আর অন্তর্বর্তীকালীন সরকার সেই দাবি মেনে নিয়েছিল।
জামায়াত আমির বলেন, গণভোটে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী একবার হলেও ‘হ্যাঁ’ ভোট চেয়েছিলেন। কিন্তু বিএনপি গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট দেয়নি বলে জনগণ মনে করে। তার দাবি, দেশে-বিদেশে দলের লোকজনকে ‘না’ ভোট দেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল। তবে প্রায় ৭০ শতাংশ মানুষ ‘হ্যাঁ’ ভোট দিয়ে পরিবর্তন ও সংস্কারের পক্ষে অবস্থান জানিয়েছে। জনগণ অতীতের রাজনীতির পরিবর্তন চায় বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
শফিকুর রহমান বলেন, তারুণ্যের আকাঙ্ক্ষা ছিল বৈষম্যহীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করা। তরুণেরা ‘উই ওয়ান্ট জাস্টিস’ স্লোগান দিয়েছিলেন। কিন্তু ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হয়নি, বরং বৈষম্য আরও বেড়েছে। বিএনপি এখন সংবিধানের কথা বলছে কেন, সেই প্রশ্ন তুলে তিনি বলেন, সাড়ে ১৫ বছর সংবিধান মেনে মিছিল করেও ফ্যাসিবাদী শাসনের অবসান ঘটানো যায়নি। বিএনপির জ্যেষ্ঠ নেতারাও ২০৪১ সাল পর্যন্ত দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার কথা বলেছিলেন।
তিনি আরও বলেন, সংবিধান মানলে ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি নির্বাচন হতো না। ওই নির্বাচন না হলে বিএনপি সরকার গঠন করত না, আর জামায়াত বিরোধী দলেও থাকত না। তার মতে, বর্তমান সংবিধান ফ্যাসিবাদের জন্ম দিয়েছে এবং একে স্থায়ী রূপ দিয়েছে। সংবিধানের যেসব জায়গায় আমূল পরিবর্তন প্রয়োজন, সেসব বিষয়ে বিএনপি ‘নোট অব ডিসেন্ট’ দিয়ে রেখেছে। যেসব বিষয়ে আপত্তি জানানো হয়নি, সেগুলোও এখন এড়িয়ে চলা হচ্ছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।
বিএনপির সংবিধান সংশোধন কমিটিতে আলোচনার আহ্বান প্রসঙ্গে শফিকুর রহমান বলেন, ‘নোট অব ডিসেন্ট’ নিয়ে সমঝোতা করতে হলে জামায়াতের সঙ্গে কমিটিতে বসতে হবে। তার অভিযোগ, বিএনপি প্রায় ৭০ শতাংশ জনগণের সঙ্গে প্রতারণা করেছে। জামায়াত জনগণের কাছে দেওয়া প্রতিশ্রুতি থেকে সরে আসবে না এবং গণভোটের রায় বাস্তবায়নে ভূমিকা রাখবে।
তিনি বলেন, এর আগে বহুবার সংবিধান সংশোধন করা হলেও আদালতে গিয়ে তা প্রত্যাখ্যাত হয়েছে। জামায়াত সেই প্রক্রিয়ায় যেতে চায় না। অতীতের ভুল ধারায় না ফিরে তারা সংস্কার চায়।
বিএনপি নির্বাচনের সময় আওয়ামী লীগের কাছে ভোট চেয়েছে বলেও অভিযোগ করেন জামায়াত আমির। এ প্রসঙ্গে তিনি শেখ হাসিনার বক্তব্য এবং আওয়ামী লীগের এক নেতার দাবি উল্লেখ করেন। তার অভিযোগ, আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগ ও ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের বিএনপি সমাজ ও দলের গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় বসাচ্ছে।
শফিকুর রহমান বলেন, অস্ত্র ও মাদকের প্রবেশ ঠেকাতে সরকার ব্যর্থ হচ্ছে। যেসব অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঠেকানোর সক্ষমতা সরকারের নেই, সেই সরকারের দেশ শাসনের অধিকার নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি। তার অভিযোগ, বিএনপি জনগণের ওপর কর ও দুর্নীতির বোঝা চাপিয়েছে, প্রবাসীদের দেশে ফেরার বিষয়ে সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা নেই এবং চাঁদাবাজির কারণে মানুষ অতিষ্ঠ।
তিনি আরও অভিযোগ করেন, চাঁদাবাজি ও দখলদারিকে কেন্দ্র করে বিএনপির নেতাকর্মীরা নিজেদের দলের লোকদেরও হত্যা করতে দ্বিধা করছেন না। সরকারের ব্যর্থতা আড়াল করতে বিরোধী দলের ওপর দায় চাপানোর চেষ্টা চলছে বলেও দাবি করেন তিনি।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের সমালোচনা করে জামায়াত আমির বলেন, তিনি নিজের মন্ত্রণালয়ের কাজ দেখার সুযোগ না পেলেও ধর্ম মন্ত্রণালয়সহ সব মন্ত্রণালয় দেখার যোগ্যতা রাখেন। তার দাবি, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর নিজ দলের এক সংসদ সদস্য বলেছেন, মাদক বন্ধ হচ্ছে না এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর এলাকা দিয়ে সবচেয়ে বড় মাদকের চালান আসে। সংবিধান সংশোধনের নামে জনগণকে বিভ্রান্ত না করে নিজের দায়িত্ব পালনে মনোযোগ দিতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর প্রতি আহ্বান জানান তিনি।
শফিকুর রহমান বলেন, জামায়াত কোনও দলীয় দাবি নিয়ে আন্দোলনে নামেনি; তারা জনগণের অধিকারের দাবিতে আন্দোলন করছে। এসব দাবি বাস্তবায়ন থেকে সরে আসতে বিভিন্নভাবে চাপ দেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ করেন তিনি। তার ভাষ্য, মৃত্যুকে ভয় না পেলেও অপমানের মৃত্যু চান না তারা। জনগণের অধিকারের পক্ষে লড়াই করে মৃত্যুবরণ করাকে তারা গৌরবের মনে করেন।
তিনি বলেন, জামায়াত নিয়মতান্ত্রিকভাবে আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছে। কেউ যেন তাদের ওপর বিশৃঙ্খলা চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা না করেন। তাদের দাবিগুলো কোনও দল, ব্যক্তি, গোষ্ঠী বা পরিবারের নয়; বরং জনগণের অধিকারসংশ্লিষ্ট।
প্রধানমন্ত্রীর উদ্দেশে জামায়াত আমির বলেন, উপযুক্ত খাবার খেয়ে ঠান্ডা মাথায় দেশ পরিচালনা করতে হবে। জনগণ তাকে ১৫০ টাকায় দুপুরের খাবার খাওয়ার কথা বলেনি; বরং মানুষ যেন স্বস্তিতে দুমুঠো ভাত খেতে পারে এবং শান্তিতে থাকতে পারে, তা নিশ্চিত করতে হবে। বিএনপির নেতাকর্মীরা মানুষের শান্তি কেড়ে নিয়েছেন বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
আগামী ৩১ অক্টোবরের লংমার্চ ঘিরে ষড়যন্ত্র না করার হুঁশিয়ারি দিয়ে শফিকুর রহমান বলেন, ১৯৯৮ সালে আওয়ামী লীগের ষড়যন্ত্র মোকাবিলা করে যৌথ লংমার্চের কাফেলা যেভাবে চট্টগ্রামে পৌঁছেছিল, এবারও তারা জনগণের জন্য একইভাবে গন্তব্যে পৌঁছাবেন। কোনও বাধা বা ষড়যন্ত্র তাদের আটকাতে পারবে না বলে মন্তব্য করেন তিনি।
জুলাই সনদ বাস্তবায়নের আহ্বান অন্য নেতাদের
আলোচনা সভায় লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) সভাপতি ড. কর্নেল (অব.) অলি আহমেদ বীর বিক্রম বলেন, দেশে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান কমছে, কলকারখানা বন্ধ হচ্ছে, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটছে এবং নিত্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধিতে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে যাচ্ছে। এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে সরকারকে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। অতীতের রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে বিরোধী দলের সঙ্গে সংঘাত এড়িয়ে জাতীয় ঐক্য গড়ে তোলা এবং জনগণের স্বার্থে দ্রুত জুলাই সনদ বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সদস্যসচিব আখতার হোসেন এমপি বলেন, জুলাই সনদের আইনি ভিত্তি নিশ্চিত না হলে সংস্কার প্রস্তাবগুলো বাস্তবায়িত না হওয়ার আশঙ্কা থেকেই তাদের দল শুরুতে এ বিষয়ে জোর দিয়েছিল। সনদে স্বাক্ষর ও গণভোট সম্পন্ন হওয়ার পরও সংস্কার বাস্তবায়নে সরকারের অনীহা সেই আশঙ্কাকে আরও স্পষ্ট করেছে।
তিনি বলেন, পুলিশ সংস্কার কমিশনের প্রস্তাব বাস্তবায়ন, সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় প্রতিষ্ঠা এবং সংসদের স্থায়ী কমিটিতে বিরোধী দলের প্রতিনিধিদের সভাপতিত্বের মতো বিষয়ে বিএনপির আপত্তি না থাকলেও উদ্যোগগুলো বাস্তবায়িত হয়নি। এতে সরকারের সংস্কার-প্রতিশ্রুতি নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। জুলাই সনদ প্রণয়ন, স্বাক্ষর, বাস্তবায়ন আদেশ জারি ও গণভোটের মধ্য দিয়ে সংস্কারের পক্ষে ধারাবাহিক অগ্রগতি হয়েছে। এখন পেছনে ফেরার সুযোগ নেই। একতরফাভাবে সংবিধান সংশোধনের উদ্যোগ বাতিল করে গণভোটের রায় অনুযায়ী সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠনের মাধ্যমে চলমান সংকটের সমাধান করার দাবি জানান তিনি।
আমার বাংলাদেশ পার্টির (এবি পার্টি) সাধারণ সম্পাদক ব্যারিস্টার ফুয়াদ বলেন, জুলাই সনদ বাস্তবায়নের প্রশ্নকে শুধু সাংবিধানিক প্রক্রিয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ রেখে রাজনৈতিক সংস্কারের দাবি এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে। গণঅভ্যুত্থান, জুলাই সনদে স্বাক্ষর ও গণভোটের মাধ্যমে যেসব রাজনৈতিক প্রশ্নের মীমাংসা হয়েছে, সেগুলো নতুন করে বিতর্কিত করা উচিত নয়।
তিনি বলেন, জুলাই সনদ ও গণভোটের রায় বাস্তবায়নের উদ্দেশ্য হলো রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর সংস্কার, দুর্নীতি প্রতিরোধ এবং ভবিষ্যতে ক্ষমতার অপব্যবহার রোধ করা। তাই জনগণের রায় উপেক্ষা না করে অবিলম্বে জুলাই সনদ বাস্তবায়নে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।
ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) হাসিনুর রহমান বীর প্রতীক বলেন, জুলাইয়ে এত রক্ত দিয়েও জাতি মুক্তি পায়নি। আওয়ামী লীগের মতো বিএনপিও একইভাবে দেশ পরিচালনা করছে বলে অভিযোগ করেন তিনি। তার মতে, বিএনপি এখনও ২০০১ সালের অবস্থানে রয়েছে এবং সময়ের সঙ্গে নিজেদের পরিবর্তন করতে পারেনি। এ অবস্থার পরিবর্তন না হলে আওয়ামী লীগের মতো বিএনপিকেও পালাতে হতে পারে বলে মন্তব্য করেন তিনি। গণভোটের রায় মেনে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন না করাকে জাতির সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা উল্লেখ করে তিনি বলেন, এর পরিণতি বিএনপির জন্য শুভ হবে না।
নেক্সাস ডিফেন্স অ্যান্ড জাস্টিসের সভাপতি ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) মোহাম্মদ হাসান নাসির বলেন, বিএনপি গণভোটের রায় মেনে জুলাই সনদ অক্ষরে অক্ষরে বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি দিয়ে ক্ষমতা গ্রহণ করলেও এখন সেই রায় মেনে নিচ্ছে না। জনগণের কাছে দেওয়া প্রতিশ্রুতি রক্ষা না করে বিএনপি জাতিকে ধোঁকা দিয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।
সাবেক রাষ্ট্রদূত সাকিব আলী বলেন, দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে এমন ব্যক্তিকে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) চেয়ারম্যান নিয়োগ দিয়ে সরকার মাঠপর্যায়ে দুর্নীতি চালিয়ে যাওয়ার বার্তা দিয়েছে। দুর্নীতি ও দলীয়করণে ব্যস্ত বিএনপি রাষ্ট্র সংস্কার করবে না বলেও মন্তব্য করেন তিনি। তার অভিযোগ, গণভোটের রায় মেনে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন না করে বিএনপি সংবিধান সংশোধনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।