ছোট পর্দার পরিচিত মুখ অভিনেত্রী তানিয়া বৃষ্টি। অভিনয়ের স্বতন্ত্রতা, সাবলীল অভিব্যক্তি এবং চরিত্রের সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নেওয়ার দক্ষতা দিয়ে দর্শকদের কাছে পরিচিতি পেয়েছেন। নাটকে নানা ধরনের চরিত্রে দক্ষ অভিনয় দিয়ে নিজের অবস্থান তৈরি করেছেন। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে তানিয়া বৃষ্টির মস্তিষ্কে টিউমার ধরা পড়ে। টিউমারের অস্ত্রোপচার ও দীর্ঘ চিকিৎসা শেষে নয় মাস পর অভিনয়ের চেনা আঙিনায় ফিরেছেন গত ২৬ অক্টোবর। ‘অংশীদার’ নাটকের শুটিংয়ে অংশ নিয়েছেন তিনি। তাঁর সার্বিক অবস্থা সম্পর্কে বলা কথা তুলে ধরেছেন - আলাউদ্দীন মাজিদ
দীর্ঘ বিরতির পর অভিনয়ে ফিরেছেন। নতুন করে ক্যামেরার সামনে দাঁড়ানোর অনুভূতি কেমন ছিল?
অভিনয় আমার ভালোবাসার জায়গা। দীর্ঘদিন শুটিং থেকে দূরে থাকার কারণে সহশিল্পী, পরিচালক ও পুরো শুটিং ইউনিটকে খুব মিস করেছি। আবার ক্যামেরার সামনে দাঁড়াতে পেরে সত্যিই অন্যরকম ভালো লাগছে। মনে হচ্ছে নিজের চেনা পরিবারে ফিরে এসেছি। পুরো টিম ভীষণ আন্তরিক ছিল। খাওয়াদাওয়া থেকে শুরু করে সংলাপ বলা, শট দেওয়া, সবসময় ক্যামেরাম্যান, পরিচালক ও প্রোডাকশনের সবাই খেয়াল রাখছিলেন আমি ঠিক আছি কি না। পরিবার যেভাবে পাশে থাকে, তারাও সেভাবেই আমাকে আগলে রেখেছেন। বিষয়টি ভীষণ ভালো লেগেছে।
শরীর ও মনের অবস্থা বর্তমানে কেমন?
১০ মাস পর এখন ঠিকঠাক খাওয়াদাওয়া, ব্যায়াম, আড্ডা, হাসাহাসি করতে পারছি। আল্লাহর রহমতে এখন সত্যিই মনে হয়, সুস্থ হতে চলেছি। রেডিওথেরাপির কঠিন সময় পেরিয়ে জীবন এখন স্বাভাবিকের দিকে যাচ্ছে। সবাই আমার পরিপূর্ণ সুস্থতার জন্য দোয়া করবেন প্লিজ।
চিকিৎসকের পরামর্শ কী এখন?
চিকিৎসক প্রথমে শুটিং করার ক্ষেত্রে বাধ সেধেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, সার্জারি ও রেডিওথেরাপির পর কেমো চলার সময় শুটিং করলে শারীরিক জটিলতা তৈরি হতে পারে। কিন্তু শুটিং আমার শান্তির জায়গা, না করতে পেরে ডিপ্রেশনে চলে যাচ্ছিলাম। অনেক অনুরোধ করে এই একটা কাজ করেছি। আমার আরও দুই মাসের কেমোথেরাপি বাকি। এরপর মাথায় আবার এমআরআই ও সিটি স্ক্যান করে টিউমারের বর্তমান অবস্থা দেখা হবে।
আপনার দুঃসময়ে কারা পাশে ছিলেন?
পুরো মিডিয়া ইন্ডাস্ট্রি পাশে ছিল। সহকর্মী ও পরিচালকরা নিয়মিত ফোন-মেসেজে খোঁজ নিয়েছেন। তবে আমার সবচেয়ে বড় শক্তি আমার মা ও বোন। বাবা নেই, তাই মা সারা রাত আমার মাথার পাশে জেগে বসে থাকতেন। চিন্তায় চিন্তায় তিনি নিজেও অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন। মা ও বোনই আমাকে ধরে রেখেছেন।
জীবনের এই কঠিন সময়টি আপনাকে কী শিখিয়েছে?
ভারতের চেন্নাইয়ের এক চিকিৎসক একসময় আমাকে জানিয়েছিলেন, আমার আয়ু হয়তো আর সাড়ে চার থেকে পাঁচ বছর। এমন কথা শুনে মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছিলাম। কেঁদেছিলাম বুক ভেঙে। তবে হাল ছাড়িনি। দীর্ঘ চিকিৎসা ও অনিশ্চয়তা পেরিয়ে ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে উঠলাম। প্রায় ১০ মাসের বিরতি কাটিয়ে সম্প্রতি আবারও শুটিংয়ে ফিরলাম। আমার কাছে নতুন করে ক্যামেরার সামনে দাঁড়ানো যেন দ্বিতীয় জীবনে ফিরে আসার মতো। জীবনের প্রতিটি অভিজ্ঞতা মানুষকে নতুন কিছু শেখায়। কঠিন সময়ের মধ্য দিয়ে গেলে পরিবার, কাছের মানুষ এবং শুভাকাক্সক্ষীদের ভালোবাসার মূল্য আরও গভীরভাবে উপলব্ধি করা যায়। এখন প্রতিটি সুন্দর মুহূর্তকে উপভোগ করতে চাই।
আপনার অসুস্থতার খবরে অসংখ্য দর্শক শুভকামনা জানিয়েছেন। বিষয়টি কীভাবে দেখছেন?
দর্শকদের ভালোবাসা একজন শিল্পীর জন্য অনেক বড় প্রাপ্তি। এই সময়ে অসংখ্য মানুষ আমার খোঁজ নিয়েছেন, আমার জন্য দোয়া করেছেন। তাঁদের ভালোবাসা ও উৎসাহ আমার কাছে অনেক মূল্যবান। সবার প্রতি আমার আন্তরিক কৃতজ্ঞতা।
বিরতির পর আপনার প্রথম কাজ ‘অংশীদার’। নাটকটির গল্প কেমন?
‘অংশীদার’ আমার অভিনয়ে ফেরার একটি বিশেষ কাজ। নাটকটির গল্প আমাদের সমাজের বাস্তবতার সঙ্গে সম্পর্কিত। বাবার মৃত্যুর পর দুই বোনের সম্পত্তির অধিকার নিয়ে যে টানাপোড়েন ও ষড়যন্ত্র তৈরি হয়, সেটিই গল্পের মূল বিষয়। এখানে আমি প্রতিবাদী এক বড় বোনের চরিত্রে অভিনয় করেছি।
চরিত্রটির ক্ষেত্রে কোন বিষয়টি আপনাকে বেশি আকৃষ্ট করেছে?
গল্পের সামাজিক বার্তাটি আমার ভালো লেগেছে। একজন নারী কীভাবে নিজের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য লড়াই করেন, সেটি এখানে উঠে এসেছে। এ ধরনের চরিত্রে অভিনয় করার মধ্যে আলাদা তৃপ্তি রয়েছে।
অভিনয়ের পাশাপাশি গানেও আপনার আগ্রহ রয়েছে। গান নিয়ে আগামী পরিকল্পনা কী?
গান আমার ছোটবেলার ভালো লাগার জায়গা। ছোটবেলা থেকেই ছায়ানট ও কচিকাঁচার মেলায় গান শিখেছি। অভিনয়ের ব্যস্ততার কারণে গান নিয়ে নিয়মিত কাজ করা হয়নি। তবে ভবিষ্যতে নিজের মৌলিক গান প্রকাশ করার ইচ্ছা রয়েছে।
অভিনয়ের ক্ষেত্রে আপনার কাছে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় কী?
চরিত্রের বিশ্বাসযোগ্যতা। দর্শক যেন পর্দায় আমাকে না দেখে চরিত্রটিকে দেখতে পান, সেটাই আমার চেষ্টা থাকে। একজন অভিনেত্রী হিসেবে প্রতিটি কাজের মাধ্যমে নিজেকে নতুনভাবে আবিষ্কার করতে চাই। দর্শকদের আরও নতুন নতুন ভালো কাজ দিয়ে যেতে চাই।
অবসরে কী করতে ভালো লাগে?
পরিবার ও নিজের পোষা বিড়ালদের সঙ্গে সময় কাটাতে ভালো লাগে। অবসরে গান শুনি, নিজের মতো সময় কাটাই। ব্যস্ততার বাইরে নিজের জন্য কিছুটা সময় রাখা প্রয়োজন বলে মনে করি।
আগামী দিনের কাজ নিয়ে প্রত্যাশা কী?
সামনে আরও ভালো গল্পে কাজ করতে চাই। দর্শকদের নতুন ধরনের চরিত্র উপহার দিতে চাই। নিজের অভিনয় দিয়ে তাঁদের ভালোবাসা ধরে রাখাই আমার প্রত্যাশা।
দর্শকের উদ্দেশে কী বলবেন?
দর্শকরা সব সময় আমার পাশে ছিলেন। তাঁদের ভালোবাসা ও শুভকামনা আমাকে সাহস জুগিয়েছে। আমি আবার অভিনয়ে ফিরেছি, সবার কাছে দোয়া চাই। আশা করি, আগামী দিনেও ভালো কাজের মাধ্যমে দর্শকদের আনন্দ দিতে পারব।