
গত এক বছরে যুক্তরাষ্ট্রের মিনেসোটা অঙ্গরাজ্যের মিনিয়াপোলিসে অভিযান চালিয়ে দশ হাজারের বেশি অভিবাসীকে আটক করেছে দেশটির বিতর্কিত অভিবাসন পুলিশ ইমিগ্রেশন অ্যান্ড কাস্টমস এনফোর্সমেন্টের (আইসিই) সদস্যরা। শহরটিতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর গুলিতে এক নারী নিহত হওয়ার ঘটনায় চলমান বিক্ষোভ ও উত্তেজনার মধ্যে মঙ্গলবার (২০ জানুয়ারি) অভিবাসন কর্মকর্তারা এই তথ্য প্রকাশ করেন।
ট্রাম্পের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের প্রচারণার অন্যতম প্রধান প্রতিশ্রুতি ছিল অভিবাসীদের বিরুদ্ধে অভিযান। দ্বিতীয় মেয়াদে দায়িত্ব নেয়ার পরই সেই প্রতি পূরণে কঠোর পদক্ষেপ নেয়া শুরু করেন ট্রাম্প। এখন যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে অভিবাসীদের গণ-নির্বাসন কর্মসূচি বাস্তবায়ন চলছে। যার মূল দায়িত্বে রয়েছে ইমিগ্রেশন অ্যান্ড কাস্টমস এনফোর্সমেন্ট বা আইসিই নামে বিতর্কিত এক সরকারি বাহিনী।
গত বছরের শুরুতেই মিনেসোটার মিনিয়াপলিসে ধরপাকড় জোড়দার করে ইমিগ্রেশন অ্যান্ড কাস্টমস এনফোর্সমেন্টের কর্মকর্তারা। ট্রাম্প মিনেসোটার ডেমোক্র্যাট নেতাদের কটাক্ষ করা শুরু করেন এবং সেখানে বসবাসকারী সোমালি বংশোদ্ভূত মানুষদের ‘আবর্জনা’ আখ্যা দিয়ে দেশ থেকে ‘ছুঁড়ে ফেলার’ কথা বলেন।
ধরপাকড়ের জন্য মিনেয়োপলিসে তিন হাজার আইসিই সদস্য পাঠান তিনি। ট্রাম্পের নির্দেশে সেই থেকে বন্দুকসহ গোটা শহর চষে বেড়াচ্ছে আইসিই সদস্যরা। সামরিক বাহিনীর স্টাইলে ছদ্মবেশী পোশাক ও মুখে মাস্ক পরে শহরে টহল দিচ্ছে।
গত ৭ জানুয়ারি এমনই এক অভিযান চালাতে গিয়ে এক মার্কিন নারীকে তার গাড়ির ভেতর গুলি করে হত্যা করে এক আইসিই সদস্য। মার্কিন সংবাদমাধ্যম এবিসি নিউজের প্রতিবেদন মতে, রেনি নিকোল ম্যাকলিন গুড নামের ৩৭ বছর বয়সি ওই নারী কোনো অভিবাসী নয়। তিন সন্তানের জননী গুডের জন্ম যুক্তরাষ্ট্রের কলোরাডো অঙ্গরাজ্যে। পুলিশি কোনো অভিযোগে তার সংশ্লিষ্টতা ছিল না।
আরও পড়ুন: মিনেসোটায় বিক্ষোভ দমনে সেনাবাহিনী নামানোর হুমকি ট্রাম্পের
এরপরও ট্রাম্প প্রশাসন ওই নারীকে ‘অভ্যন্তরীণ সন্ত্রাসী’ হিসেবে চিত্রিত করে। যা বিশ্বব্যাপী ক্ষোভের সৃষ্টি করে। আমেরিকাজুড়ে শুরু হয় বিক্ষোভ। প্রতিবাদে রাস্তায় নামেন হাজার হাজার মানুষ। যা এখনও অব্যাহত রয়েছে। বিক্ষোভকারীরা মিনেসোটা থেকে অভিবাসন পুলিশ তথা আইসিই এজেন্টদের সরিয়ে নেয়ার দাবি জানান।
সেই থেকে অভিবাসনবিরোধী অভিযানের প্রতিবাদে বিক্ষোভে উত্তাল যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন শহর। স্থানীয় সময় গত সোমবারও জার্জিয়া অঙ্গরাজ্যের আটলান্টা শহরে রাস্তায় নামেন শত শত মানুষ। লুথার কিং দিবস উপলক্ষে সামাজিক অবিচারের বিরুদ্ধে স্লোগান দেন বিক্ষোভকারীরা। এ সময় অভিবাসননীতি ও আইসির বিরোধিতা করেন আন্দোলনকারীরা। আইসিই মানুষের অধিকার লঙ্ঘন করছে উল্লেখ করে অংশগ্রহণকারীরা বলেন, বর্তমান নীতি সামাজিক অবিচার বাড়াচ্ছে।
এদিকে মিনেসোটায় আইসিই অভিযানের বিরুদ্ধে সরাসরি মাঠে নামছে স্থানীয় কমিউনিটি। মিনিয়াপোলিস ও সেন্ট পলে স্বেচ্ছাসেবীরা গড়ে তুলেছে নেবারহুড প্যাট্রোল ও র্যাপিড রেসপন্স নেটওয়ার্ক। অভিবাসন অভিযানের সময় প্রতিবেশীদের সতর্ক করা ও নজরদারির মধ্য দিয়েই নিজেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে চায় তারা।
চলমান এই বিক্ষোভের মধ্যেও ধরপাকড় অব্যাহত রয়েছে। মঙ্গলবার (২০ জানুয়ারি) যুক্তরাষ্ট্রের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ক্রিস্টি নোয়েম জানান, মিনিয়াপোলিসে অভিযান চালিয়ে দশ হাজারের বেশি অভিবাসীকে আটক করেছে তার দফতর। মিনিসোটার গভর্নর ও মেয়র অপরাধীদের রক্ষা করছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি। এ নিয়ে রাজ্য ও কেন্দ্রীয় নেতাদের মধ্যে তীব্র বির্তকের সৃষ্টি হয়।
আটক অভিবাসীদের ‘ক্রিমিনাল’ অভিহিতকরে বর্ডার পেট্রোলের সিনিয়র কর্মকর্তা গ্রেগ বোভিনো বলেন, ‘এই (ট্রাম্প) প্রশাসনের সময়কালে গত এক বছরে মিনিয়াপলিসে ১০ হাজারেরও বেশি অপরাধী অবৈধ অভিবাসীকে গ্রেফতার করা হয়েছে। এবং মাত্র গত ছয় সপ্তাহে মিনিয়াপলিসের সবচেয়ে বিপজ্জনক অপরাধীদের মধ্যে ৩ হাজার জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে।’
ট্রাম্প ক্ষমতায় এসেছিলেন মার্কিন ইতিহাসের সবচেয়ে বড় গণ-নির্বাসনের প্রতিশ্রুতি দিয়ে, যার লক্ষ্য ছিল যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসকারী ১ কোটিরও বেশি অননুমোদিত অভিবাসীর নির্বাসন। গত বছরের আগস্ট মাসে সিএনএন জানায়, ট্রাম্প ক্ষমতায় আসার পর সাত মাসে শুধুমাত্র আইসিই প্রায় ২ লাখ অভিবাসীকে আটক করে তাদের নিজ নিজ দেশে ফেরত পাঠিয়েছে।
মন্তব্য করুন