
বিদেশে অবস্থান করেও পরীক্ষা না দিয়ে ফাজিল পাস!
বকশীগঞ্জে শিক্ষাঙ্গনে তোলপাড়, তদন্তে ইসলামি আরবি বিশ্ববিদ্যালয়
কেন্দ্র বাতিলের দাবিতে ক্ষুব্ধ এলাকাবাসী
সামরুল হক (জামালপুর প্রতিনিধি):
ধাপ–১ : ঘটনার সূচনা
জামালপুরের বকশীগঞ্জ উপজেলায় পরীক্ষা না দিয়েই ফাজিল পাস করার এক বিস্ময়কর ও উদ্বেগজনক ঘটনা সামনে এসেছে। মোস্তাকিম বিল্লাহ নামে এক শিক্ষার্থী পরীক্ষায় অংশ না নিয়েও উত্তীর্ণ হওয়ায় স্থানীয় শিক্ষাঙ্গনে চরম আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছে। এ ঘটনায় শিক্ষাব্যবস্থার স্বচ্ছতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন অভিভাবক, শিক্ষক ও সচেতন মহল।
ধাপ–২ : শিক্ষার্থী ও ফলাফলের তথ্য:
অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা শিক্ষার্থী মোস্তাকিম বিল্লাহ বাট্টাজোড় ইউনিয়নের ফুলদহপাড়া গ্রামের বাসিন্দা। তিনি মঞ্জুরুল হকের ছেলে এবং বাট্টাজোড় কেরামতিয়া রিয়াজুল ইসলাম কামিল মাদ্রাসার নিয়মিত শিক্ষার্থী।
তাঁর শিক্ষাবর্ষ ২০২১–২০২২, রেজিস্ট্রেশন নম্বর ২১২০৩১১৯১ এবং রোল নম্বর ২১২০৩১১৯১।
ইসলামি আরবি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে অনুষ্ঠিত ফাজিল পরীক্ষায় ইসলামিক স্টাডিজ বিষয়ে (বিষয় কোড–৪১৬) তিনি জিপিএ ৩.২৫ পেয়ে উত্তীর্ণ হন—যা দেখে সবাই বিস্মিত হয়ে পড়েন।
ধাপ–৩ : পরীক্ষার দিনে বিদেশে অবস্থান:
অনুসন্ধানে জানা গেছে, ২০২৫ সালের ২৭ নভেম্বর অনুষ্ঠিত উক্ত পরীক্ষার সময় মোস্তাকিম বিল্লাহ দেশে ছিলেন না। তিনি তখন সৌদি আরবে অবস্থান করছিলেন। ফলে বাস্তবিক অর্থেই তাঁর পক্ষে ওই পরীক্ষায় অংশ নেওয়া সম্ভব ছিল না।
এই তথ্য নিশ্চিত হওয়ার পরই প্রশ্ন ওঠে—পরীক্ষা না দিয়েই একজন শিক্ষার্থী কীভাবে পাস করলেন?
ধাপ–৪ : সন্দেহের তীর কেন্দ্র সুপারের দিকে:
ঘটনাটি জানাজানি হওয়ার পর অভিযোগের তীর গিয়ে পড়ে বাট্টাজোড় কেরামতিয়া রিয়াজুল ইসলাম কামিল মাদ্রাসার অধ্যক্ষ ও কেন্দ্র সুপার সুলতান মাহমুদ খসরুর দিকে। স্থানীয়দের অভিযোগ, কেন্দ্র সুপার ও মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষের সহযোগিতা ছাড়া এমন অনিয়ম কোনোভাবেই সম্ভব নয়।
এলাকাবাসীর দাবি, পরীক্ষার্থী যদি কেন্দ্রে উপস্থিত না থাকেন, তবে তাঁর পরীক্ষার খাতা বোর্ডে পাঠানোর প্রশ্নই ওঠে না। তাহলে ফলাফল এল কীভাবে?
ধাপ–৫ : মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষের অবস্থান
অভিযোগ প্রসঙ্গে অধ্যক্ষ সুলতান মাহমুদ খসরু বলেন,
“পরীক্ষার সময় মোস্তাকিম বিল্লাহ সৌদি আরবে ছিলেন এবং পরীক্ষায় অংশ নেননি—এটা সত্য। কিন্তু তিনি কীভাবে পাস করলেন, তা আমার জানা নেই। বিষয়টি জানার পর ইসলামি আরবি বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ আমাদের প্রয়োজনীয় কাগজপত্র পাঠাতে বলেছে। নির্দেশনা অনুযায়ী ১২ দিনের মধ্যে সব কাগজপত্র পাঠানো হবে। এরপর তারা যে সিদ্ধান্ত নেবে, সেটিই চূড়ান্ত হবে।”
তবে তাঁর এই বক্তব্যে সন্তুষ্ট নন স্থানীয় সচেতন মহল।
ধাপ–৬ : কেন্দ্র বাতিলের দাবি:
এ ঘটনায় বকশীগঞ্জ প্রেস ক্লাবের সভাপতি আবদুল লতিফ লায়ন বলেন,
“এই ঘটনার দায় কোনোভাবেই মাদ্রাসার অধ্যক্ষ এড়াতে পারেন না। পরীক্ষার্থী উপস্থিত না থাকলে তার খাতা বোর্ডে গেল কীভাবে? অনিয়ম যা হওয়ার, তা মাদ্রাসা থেকেই হয়েছে। তাই শিক্ষাব্যবস্থার সুনাম রক্ষায় এই পরীক্ষা কেন্দ্র বাতিল করা উচিত।”
এ দাবির সঙ্গে একমত পোষণ করছেন স্থানীয় শিক্ষক, অভিভাবক ও এলাকাবাসী।
ধাপ-৭: অপরদিকে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল বকশীগঞ্জ উপজেলা মেরুচর ইউনিয়ন ছাত্রদলের সভাপতি
মোঃ রহমত আলী বলেন , উক্ত বিষয়টি আমি ফেসবুকে মাধ্যমে জানতে পারি, দায়িত্বশীলদের গাফিলতি বা জালিয়াতি কারণে এরকম ঘটনা ঘটেছে,তিনি আরো বলেন এরকম ঘটনা যদি ঘটে থাকে তাহলে যারা কেন্দ্রে দায়িত্বে ছিলেন তাদের বিরুদ্ধে দ্রুত আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হোক এবং তিনি আরো বলেন উক্ত শিক্ষার্থীর ফলাফলটি কেন্দ্রীয় বোর্ড থেকে দ্রুত বাতিল করা হোক।
ধাপ–৮ : বিশ্ববিদ্যালয়ের তদন্ত কার্যক্রম:
ইসলামি আরবি বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত শুরু করেছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক ইয়াসিন আলী বলেন,
“বাট্টাজোড় কেরামতিয়া রিয়াজুল ইসলাম কামিল মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষের কাছে সংশ্লিষ্ট পরীক্ষার্থীর সব কাগজপত্র তলব করা হয়েছে। যাচাই-বাছাই শেষে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”
বিশ্ববিদ্যালয় সূত্র জানায়, অনিয়ম প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
ধাপ–৯ : শিক্ষার্থীর বক্তব্য অনুপস্থিত:
এ বিষয়ে অভিযুক্ত শিক্ষার্থী মোস্তাকিম বিল্লাহর বক্তব্য জানার চেষ্টা করা হলেও তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি। তাঁর মোবাইল ফোনটি বর্তমানে তাঁর মায়ের কাছে থাকায় সরাসরি তাঁর কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
ধাপ–১০ : জনমনে প্রতিক্রিয়া ও প্রত্যাশা:
এই ঘটনা শিক্ষাঙ্গনে গভীর উদ্বেগ তৈরি করেছে। সাধারণ মানুষ বলছেন, পরীক্ষা ছাড়াই যদি ফলাফল আসে, তাহলে পুরো শিক্ষাব্যবস্থার ওপর মানুষের আস্থা নষ্ট হবে। দ্রুত তদন্ত শেষ করে দোষীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন তারা।
মন্তব্য করুন