
মানুষের স্মৃতিতে এখনও টিকে আছে নদটি, কিন্তু বাস্তবে ঢাকার কেরানীগঞ্জের শিং নদ আর নেই। কোথাও এটি শুধুমাত্র সামান্য নালার আকারে রয়ে গেছে, কোথাও কোনো চিহ্নই চোখে পড়ে না। তবে সরকারি নথিতে নদটির অস্তিত্ব থাকলেও সরেজমিনে এটি খুঁজে পাওয়া দুঃসাধ্য। স্থানীয় বয়োজ্যেষ্ঠদের স্মৃতিতে এখনও তরতাজা শিং নদের ভরা যৌবনের গল্প বেঁচে আছে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নানা স্থাপনায় স্থানীয়রা নদটির সুবিধা নিয়েছেন, আবার সরকারও ভরাট করে সড়ক নির্মাণ করেছে। বিশ্ব নদীরক্ষা দিবসকে সামনে রেখে যমুনা টেলিভিশন এ নদের সন্ধান করেছে।
নদের নাম শিং হলেও স্থানীয়ভাবে পরিচিত সিংহ নদ নামে। নামকরনের বিষয়ে স্থানীয় একজন বলেন, ‘নদীটা বড় আছিলো। ওর ঢেউটা যে উঠতো, পানি ডাকে। সিংহর মতোই ডাক আছিলো। এই কারণে এইটার নাম থুইছে সিংহ নদী।’
একসময় এই নদটি ছিল অঞ্চলটির লাইফলাইন। সেই কথাও উঠে আসে এখানকার মানুষের আলাপচারিতায়। বয়োজ্যেষ্ঠ এক নারী বলেন, ‘একসময় এহান দিয়া নাও গেছে, বোট গেছে।’ আরেকজন বয়োজ্যেষ্ঠ পুরুষ বলেন, ‘নৌকা দিয়া ওই যে নবাবগঞ্জ, দোহার, যত মালামাল আছিলো, এই খাল দিয়া যাইতো।’
কাগজে কলমে ১৭ কিলোমিটার দীর্ঘ এই নদটি খুঁজে পেতে বেগ পোহাতে হয়েছে। চলতি পথে নানা শ্রেণী পেশার মানুষকে জিজ্ঞেস করে পাওয়া গেলো নদের অবস্থান। তবে বেশিরভাগ জায়গায় সরু নালার মতো। এমনকি কোথাও পানির অস্তিত্বই নেই। স্থানীয় বাসিন্দারা বলেন, এই নদটি বাঁচলে জনগণ ও কৃষক বাঁচবে। মাটি কেটে ভরাট করারও অভিযোগও করেন তারা।
সরেজমিনে শিং নদের কোনো অস্তিত্ব খুঁজে না পেয়ে সরকারি নথিতে এর অবস্থান দেখা যাক। কেরানীগঞ্জ ভূমি অফিসে গিয়ে দুই জন সার্ভেয়ার দেলোয়ার হোসেন ও আফজাল হোসেনের সঙ্গে প্রতিবেদকের কথা হয়। সেখানে নামানো হয় সব নথি ও নকশা। সিএস খতিয়ানে শিং নদের গড় প্রস্থ ১২০ ফুটের বেশি। তবে পরের জরিপে উঠে আসে ভয়ানক বিপর্যয়ের কথা। ধর্মশুর এবং আকচাইল মৌজায় আরএস খতিয়ানে শিং নদের বেশিরভাগ জায়গা রেকর্ড দেখানো হয়েছে ব্যক্তি মালিকানায়।
সার্ভেয়াররা জানান, নদের একপাশ দিয়ে পাকা রাস্তা হয়ে গেছে। আর বাকিটা ব্যক্তি মালিকানায় রেকর্ড হয়েছে। অন্যদিকে, শুধু খালের একটু অংশ খালের আরএস এ রেকর্ড দেখানো হয়েছে। নদী ভরাট হয়ে গেছে। সরকারি জনস্বার্থে প্রতিনিধিরা এখানে রাস্তা বানিয়েছে।
আবারও নদের নকশায় চোখ ফেরানো যাক। এবার আরও একটি তথ্য উল্টে যায়। জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের নথি যেখানে বলছে আদি বুড়িগঙ্গা থেকে উৎপত্তি হয়ে ধলেশ্বরীতে পড়েছে শিং নদ, আর সার্ভেয়াররা বলছেন অন্যরকম কথা। তারা বলেন, ভান্ডারখোলা মৌজার থেকে শুরু ধলেশ্বরী নদী। আবার দক্ষিণের সোনাকান্দার পরে যে আরেকটা মৌজা আছে, সেখানে গিয়ে ধলেশ্বরী নদের লগে মিলিত হয়েছে। তাইলে উৎপত্তিও ধলেশ্বরী, শেষও ধলেশ্বরী।
এদিকে, উৎসমুখ খুঁজতে গিয়ে সার্ভেয়ার দেখতে পান বেদখল হয়েছে প্রাচীন এই প্রবাহ মুখ। দাগ নম্বর ধরে খুঁজে বোঝা যায় নদ আর নেই। তারা বলেন, মাদরাসা, মাঠ ও রাস্তা যাই পড়ুক না কেন যেকোনো জায়গাতেই তার অবস্থান আছে।
এমনকি সরেজমিনে গিয়ে প্রমাণ মেলে। সেখানে গিয়ে দেখা যায়, নদের মুখেই বালি ফেলে তৈরি করা হয়েছে সড়ক। একটু দূরেই স্থাপনা। স্থানীয়দের তথ্য অনুযায়ী, মূল রাস্তা থেকে শুরু করে প্রায় ৭ একরের জায়গা এখানে।
মাদ্রাসার প্রতিনিধিরা জানান, এটি সম্পূর্ণ তাদের উদ্যোগে এবং খরচে করা হয়েছে। সরকারি কোনো অনুমোদন এখনও নেওয়া হয়নি, তবে তারা এটিকে অস্থায়ী প্রকল্প হিসেবে চালাচ্ছেন।
এ বিষয়ে কেরানীগঞ্জের সহকারী কমিশনার-ভূমি জান্নাতুল মাওয়া বলেন, নদীর গতিপথ চেঞ্জ করে রাস্তাটা নির্মাণ করার তাদের কোন অনুমতি ছিল না। সেজন্য আমরা কাজটা বন্ধ করে দিয়েছি। তাদের মালিকানার ডকুমেন্টসগুলো কি রকম আছে বা কি আছে ওগুলো যাচাই-বাছাই করে নদীর জায়গায় যদি প্রয়োজন হয় আমরা অবশ্যই সেখানে উচ্ছেদের প্রস্তাব পাঠাবো।
কয়েক বছর আগে খনন হলেও জীবন ফিরে পায়নি শিং নদ। সবার সামনে ধীরে ধীরে নদটি বিলীন হলেও বাঁচাতে এগিয়ে আসেনি কেউ। অথচ মানুষের প্রয়োজনেই প্রাকৃতিক এই প্রবাহ জরুরি। রাষ্ট্রযন্ত্র কি এবার চোখ।
মন্তব্য করুন