
ভাঙনের মুখে দেওয়ানগঞ্জ-খোলাবাড়ী সড়ক, চরম ঝুঁকিতে জনজীবন ও যোগাযোগ ব্যবস্থা
সামরুল হক, জামালপুর প্রতিনিধি:
জামালপুরের দেওয়ানগঞ্জ উপজেলা সদরের সঙ্গে চিকাজানী ইউনিয়নের খোলাবাড়ী এলাকার সংযোগের একমাত্র গুরুত্বপূর্ণ সড়কটি বর্তমানে ভয়াবহ নদীভাঙনের কবলে পড়েছে। প্রমত্তা যমুনা নদীর অব্যাহত ভাঙন ও তীব্র স্রোতের কারণে সড়কটির একটি বড় অংশ মারাত্মক ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। স্থানীয়দের আশঙ্কা, দ্রুত কার্যকর ও স্থায়ী পদক্ষেপ গ্রহণ না করা হলে যেকোনো মুহূর্তে এ সড়কের সঙ্গে উপজেলা সদরের যোগাযোগ সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়তে পারে।
সরেজমিনে যা দেখা গেল:
সম্প্রতি সরেজমিনে হুদার মোড় এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, সড়কের একাধিক স্থানে মাটি সরে গিয়ে পাকা অংশে গভীর ফাটল সৃষ্টি হয়েছে। কোথাও কোথাও সড়কের নিচের মাটি ধসে গিয়ে অংশবিশেষ ঝুলন্ত অবস্থায় রয়েছে। নদীর পানির স্রোত সরাসরি সড়কের গায়ে আঘাত হানছে। স্থানীয়দের ভাষ্য, কয়েকদিন আগেও যেখানে মানুষ নির্বিঘ্নে চলাচল করতেন, সেখানে এখন আতঙ্ক নিয়ে যানবাহন পারাপার হচ্ছে।
গ্রামবাসীরা জানান, গত কয়েক সপ্তাহে ভাঙনের গতি অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে। এভাবে চলতে থাকলে অন্তত ৫০০ মিটার সড়ক নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যেতে পারে। এতে শুধু খোলাবাড়ী নয়, পার্শ্ববর্তী ফুলছড়ি উপজেলার এরেন্ডাবাড়ী ইউনিয়নের সঙ্গেও সরাসরি সড়ক যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যাবে।
জনজীবনে চরম প্রভাব:
এ সড়ক দিয়ে প্রতিদিন হাজারো মানুষ উপজেলা সদরে যাতায়াত করেন। শিক্ষার্থীরা স্কুল-কলেজে, রোগীরা হাসপাতালে, কৃষকরা ফসল নিয়ে বাজারে—সবকিছুর জন্য নির্ভরশীল এই সড়কের ওপর। সড়কটি বিচ্ছিন্ন হলে—
শিক্ষার্থীদের পাঠদান ব্যাহত হবে:
জরুরি রোগী পরিবহনে মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি হবে
কৃষিপণ্য বাজারজাত করতে না পেরে ক্ষতির মুখে পড়বেন কৃষকরা
ব্যবসা-বাণিজ্যে স্থবিরতা নেমে আসবে
সাধারণ মানুষের নিত্যপ্রয়োজনীয় কাজ ব্যাহত হবে
স্থানীয় ব্যবসায়ীরা জানান, যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হলে বাজারে পণ্য সরবরাহ কমে যাবে এবং দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি পেতে পারে।
নদীভাঙনে নিঃস্ব শতাধিক পরিবার:
নদীভাঙনের থাবা শুধু সড়কেই সীমাবদ্ধ নয়। নদীপাড়ের বহু পরিবারের বসতভিটা ও ফসলি জমি ইতোমধ্যে বিলীন হয়ে গেছে। শতাধিক পরিবার সর্বস্ব হারিয়ে অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে তাকিয়ে আছে। অনেকে বাড়িঘর সরিয়ে নিরাপদ স্থানে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
এ ভাঙন থেকে স্থায়ী মুক্তির দাবিতে সম্প্রতি চিকাজানী ইউনিয়নের চর ডাকাতিয়া পাড়া এলাকায় নদীতীরে মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করেন ক্ষতিগ্রস্তরা। মানববন্ধনে বক্তারা বলেন, প্রতিবছর একই দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে, কিন্তু স্থায়ী সমাধান মিলছে না।
নির্বাচনেও পড়তে পারে প্রভাব:
আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে সড়কটির গুরুত্ব আরও বেড়েছে। নির্বাচনী সরঞ্জাম পরিবহন, ভোটকেন্দ্রে কর্মকর্তাদের যাতায়াত এবং ভোটারদের নিরাপদ চলাচলের জন্য এ সড়ক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সড়কটি ভেঙে গেলে নির্বাচনী কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
কী বলছেন স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা:
স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা জানান, পানি উন্নয়ন বোর্ড জরুরি ভিত্তিতে জিওব্যাগ ও বালুর বস্তা ফেলে ভাঙন প্রতিরোধের চেষ্টা করছে। তবে যমুনার প্রবল স্রোতের সামনে এসব ব্যবস্থা সাময়িক এবং অপ্রতুল। তারা দ্রুত স্থায়ী বাঁধ নির্মাণ, নদীশাসন প্রকল্প গ্রহণ ও তীর সংরক্ষণে কংক্রিট ব্লক ব্যবহারের দাবি জানিয়েছেন।
প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি টেকসই সমাধান:
বিশেষজ্ঞদের মতে, যমুনা নদীর গতিপথ ও স্রোতের ধরণ বিবেচনায় নিয়ে সমন্বিত নদীশাসন পরিকল্পনা গ্রহণ জরুরি। এর মধ্যে থাকতে পারে—
স্থায়ী প্রতিরক্ষা বাঁধ নির্মাণ:
জিওটেক্সটাইল ও কংক্রিট ব্লক স্থাপন
নদী ড্রেজিং ও তীর সংরক্ষণ
ঝুঁকিপূর্ণ পরিবারগুলোর পুনর্বাসন
আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা
দ্রুত পদক্ষেপ না নিলে ভয়াবহ পরিণতি:
স্থানীয়দের দাবি, জনগুরুত্বপূর্ণ এ সড়ক রক্ষায় অবিলম্বে কার্যকর ও টেকসই পদক্ষেপ নিতে হবে। অন্যথায় আসন্ন বর্ষা মৌসুমে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে। যোগাযোগ ব্যবস্থা ভেঙে পড়লে কয়েক হাজার মানুষের জীবন-জীবিকা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে এবং স্থানীয় অর্থনীতি স্থবির হয়ে পড়বে।
এখন সময় দ্রুত সিদ্ধান্ত ও বাস্তব পদক্ষেপের। না হলে যমুনার গর্ভে বিলীন হবে শুধু একটি সড়ক নয়—ভেঙে পড়বে একটি জনপদের স্বপ্ন, নিরাপত্তা ও ভবিষ্যৎ।
মন্তব্য করুন