
টুঙ্গিপাড়ায় বীর মুক্তিযোদ্ধা শেখ কবির হোসেনের রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় শেষ বিদায়
সামরুল হক:
নিষিদ্ধঘোষিত বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ-এর সভাপতি ও ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার চাচা, বীর মুক্তিযোদ্ধা শেখ কবির হোসেনকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় দাফন করা হয়েছে। রোববার (১৫ ফেব্রুয়ারি) গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায় দ্বিতীয় জানাজা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে তাকে চিরনিদ্রায় শায়িত করা হয়। তাঁর শেষ বিদায়ে স্থানীয় প্রশাসন, রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, মুক্তিযোদ্ধা ও সর্বস্তরের মানুষ উপস্থিত ছিলেন।
রাজধানীতে মৃত্যু, এলাকায় শোকের ছায়া:
পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, শনিবার সকালে রাজধানীর একটি বেসরকারি হাসপাতালে বার্ধক্যজনিত নানা জটিলতায় চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি ইন্তেকাল করেন। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৮৪ বছর। মৃত্যুসংবাদ ছড়িয়ে পড়লে টুঙ্গিপাড়া ও গোপালগঞ্জ জেলায় শোকের ছায়া নেমে আসে। আত্মীয়-স্বজন, রাজনৈতিক সহকর্মী ও এলাকাবাসী গভীর শোক প্রকাশ করেন।
দুই দফা জানাজা, রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় সম্মাননা:
মরহুমের প্রথম জানাজা অনুষ্ঠিত হয় রাজধানীর কলাবাগান মসজিদে। সেখানে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ অংশ নেন। পরে তাঁর মরদেহ গোপালগঞ্জে নেওয়া হলে টুঙ্গিপাড়ার খান সাহেব শেখ মোশাররফ হোসেন স্কুল অ্যান্ড কলেজ মাঠে দ্বিতীয় জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। জানাজা শেষে রাষ্ট্রীয় মর্যাদার অংশ হিসেবে তাঁকে গার্ড অব অনার প্রদান করা হয় এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষ থেকে গান স্যালুট দেওয়া হয়। এরপর স্থানীয় শেখ বাড়ি পারিবারিক কবরস্থানে দাফন সম্পন্ন করা হয়।
গণ্যমান্য ব্যক্তিদের উপস্থিতি:
জানাজা ও দাফন অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন গোপালগঞ্জ-৩ আসনের সদ্য নির্বাচিত সংসদ সদস্য এস এম জিলানী, মরহুমের ভাই শেখ নাদির হোসেন লিপু, গোপালগঞ্জ পৌরসভার সাবেক মেয়র শেখ রকিব হোসেন, ছেলে শেখ অনি, স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধারা এবং উপজেলা প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। এছাড়া বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠনের নেতাকর্মীরাও শেষ বিদায়ে অংশ নেন।
পারিবারিক ও শিক্ষাজীবন:
শেখ কবির হোসেন ১৯৪২ সালের ৩ ফেব্রুয়ারি গোপালগঞ্জ জেলার টুঙ্গিপাড়ায় জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বাবা খান সাহেব শেখ মোশাররফ হোসেন এবং মা রাহেলা খাতুন। সম্পর্কে তিনি জাতির পিতা শেখ মুজিবুর রহমান-এর আপন চাচাতো ভাই।
তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। ছাত্রজীবন থেকেই তিনি সামাজিক ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন।
কর্মজীবন ও অবদান:
কর্মজীবনে শেখ কবির হোসেন বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো, বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশন ও সোনালী ব্যাংকে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন। দক্ষতা, সততা ও নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালনের জন্য তিনি সহকর্মীদের কাছে সমাদৃত ছিলেন। ১৯৭৫ সালে তিনি সরকারি চাকরি থেকে পদত্যাগ করেন।
মুক্তিযুদ্ধের একজন সাহসী সংগঠক ও সহযোগী হিসেবে তাঁর অবদান স্থানীয়ভাবে বিশেষভাবে স্মরণ করা হয়। স্বাধীনতার পরও তিনি সামাজিক উন্নয়ন, শিক্ষা বিস্তার ও জনকল্যাণমূলক কর্মকাণ্ডে সক্রিয় ভূমিকা রাখেন। এলাকাবাসীর কাছে তিনি ছিলেন সাদাসিধে, বিনয়ী ও মানবিক গুণাবলির অধিকারী একজন মানুষ।
শোক ও স্মৃতিচারণ:
জানাজায় বক্তারা বলেন, শেখ কবির হোসেনের মৃত্যুতে টুঙ্গিপাড়া তথা গোপালগঞ্জ এক নিবেদিতপ্রাণ দেশপ্রেমিককে হারালো। তাঁর আদর্শ, সততা ও দেশপ্রেম ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবে।
রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় শেষ বিদায়ের মধ্য দিয়ে একজন মুক্তিযোদ্ধার জীবনের পরিসমাপ্তি ঘটলেও তাঁর স্মৃতি ও অবদান স্থানীয় মানুষের হৃদয়ে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে।
মন্তব্য করুন