
জামালপুরে স্ত্রীকে পুড়িয়ে হত্যার অভিযোগে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী স্বামী গ্রেফতার
দগ্ধ অবস্থায় উদ্ধার গৃহবধূর মরদেহ, এলাকায় চাঞ্চল্য
সামরুল হক, বিশেষ প্রতিনিধি:
জামালপুর শহরে স্ত্রীকে পুড়িয়ে হত্যার অভিযোগে সুপ্রিম কোর্টের এক আইনজীবীকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। শুক্রবার (৬ মার্চ) দিবাগত রাত আনুমানিক ১টার দিকে শহরের দড়িপাড়া মন্ডলপাড়া এলাকায় এ মর্মান্তিক ঘটনা ঘটে। নৃশংস এই ঘটনার খবর ছড়িয়ে পড়লে পুরো এলাকায় চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয় এবং স্থানীয়দের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, খবর পেয়ে দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে অভিযান চালায় পুলিশ। জামালপুর অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সদর সার্কেল) ইয়াহিয়া আল মামুনের নেতৃত্বে এবং জামালপুর সদর থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মিজানুর রহমানের সহযোগিতায় পরিচালিত অভিযানে রাত আনুমানিক দেড়টার দিকে অভিযুক্ত সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী হোসাইন মো. তাইফুর (৪০) কে গ্রেফতার করা হয়। একই সময় ঘটনাস্থল থেকে নিহত তাহমিনা আক্তার তানিয়া (৩৬)-এর দগ্ধ মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। পরে মরদেহ থানায় নিয়ে যাওয়া হয় এবং আইনি প্রক্রিয়া শুরু করা হয়।
দীর্ঘ ১৭ বছরের সংসার, ছিল এক ছেলে ও এক মেয়ে
স্থানীয় ও পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, প্রায় ১৭ বছর আগে জামালপুর শহরের মুকুন্দবাড়ী এলাকার বাসিন্দা আবু তাহেরের মেয়ে তাহমিনা আক্তার তানিয়ার সঙ্গে দড়িপাড়া এলাকার বাসিন্দা এবং পেশায় সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী হোসাইন মো. তাইফুরের বিয়ে হয়। দীর্ঘ দাম্পত্য জীবনে তাদের এক ছেলে তাসফিক এবং এক মেয়ে রয়েছে।
তবে স্থানীয়দের দাবি, দীর্ঘদিন ধরেই তাদের সংসারে অশান্তি চলছিল। বিশেষ করে স্বামীর মাদকাসক্তি ও বিভিন্ন পারিবারিক বিষয় নিয়ে প্রায়ই তাদের মধ্যে ঝগড়া-বিবাদ হতো বলে প্রতিবেশীরা জানিয়েছেন। এ নিয়ে একাধিকবার দুই পরিবারের মধ্যেও আলোচনা হয়েছে বলে জানা গেছে।
ঘটনার আগে বাবার বাড়ি থেকে স্বামীর বাসায় যান তানিয়া:
নিহতের স্বজনরা জানান, বৃহস্পতিবার (৫ মার্চ) রাত সাড়ে ৮টার দিকে বাবার বাড়ি থেকে স্বামীর বাসায় যান তানিয়া। এরপর গভীর রাতে হঠাৎ পরিবারের কাছে মর্মান্তিক খবর আসে।
নিহতের মামা মনোয়ার ইসলাম কর্নেল জানান, “রাত দেড়টার দিকে তানিয়ার ভাই তুহিন আমাকে ফোন করে জানায়, তার বোনকে হত্যা করা হয়েছে। খবর শুনে আমরা সবাই হতবাক হয়ে যাই। আমরা চাই ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত হোক এবং দোষীর সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করা হোক।”
ধোঁয়া দেখে সন্দেহ, জানালা ভেঙে দেখা যায় দগ্ধ মরদেহ:
ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী স্থানীয় বাসিন্দা শাকিল লস্কর জানান, রাত আনুমানিক দেড়টার দিকে এলাকাবাসী খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে ছুটে যান। সেখানে গিয়ে দেখা যায় বাসার ভেতর থেকে ধোঁয়া বের হচ্ছে। বিষয়টি সন্দেহজনক মনে হলে বাইরে থেকে কাচের জানালা ভেঙে ভেতরে তাকানো হয়।
তিনি বলেন, “জানালা দিয়ে ভেতরে তাকিয়ে আমরা দেখি খাটের ওপর এক নারীর দগ্ধ দেহ পড়ে আছে। পরে আমরা দ্রুত পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিসকে খবর দিই।”
খবর পেয়ে পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনেন এবং ভেতর থেকে দগ্ধ মরদেহ উদ্ধার করেন।
অভিযুক্ত স্বামীকে তাৎক্ষণিক গ্রেফতার
ঘটনার পরপরই পুলিশ অভিযান চালিয়ে বাসা থেকেই অভিযুক্ত আইনজীবী হোসাইন মো. তাইফুরকে গ্রেফতার করে। তাকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য থানায় নেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে।
জামালপুর অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সদর সার্কেল) ইয়াহিয়া আল মামুন জানান, স্থানীয়দের মাধ্যমে খবর পেয়ে পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা ঘটনাস্থলে গিয়ে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনেন। পরে ঘরের ভেতর থেকে এক নারীর দগ্ধ মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
তিনি আরও জানান, “ঘটনার সঙ্গে জড়িত সন্দেহে নিহতের স্বামী হোসাইন মো. তাইফুরকে তাৎক্ষণিকভাবে গ্রেফতার করা হয়েছে। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, পারিবারিক কলহের জেরেই এই ঘটনা ঘটেছে। তবে প্রকৃত কারণ উদঘাটনে বিস্তারিত তদন্ত চলছে।”
ময়নাতদন্তের জন্য মরদেহ পাঠানো হয়েছে:
পুলিশ জানায়, নিহতের মরদেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়েছে। ঘটনার প্রকৃত কারণ নির্ণয় এবং হত্যাকাণ্ডের পেছনের বিস্তারিত তথ্য উদঘাটনে পুলিশ তদন্ত শুরু করেছে।
এলাকায় শোক ও ক্ষোভ:
এ ঘটনার পর পুরো এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে। স্থানীয় বাসিন্দারা এমন নৃশংস ঘটনার দ্রুত বিচার দাবি করেছেন। একই সঙ্গে দোষীদের কঠোর শাস্তির দাবি জানিয়েছেন তারা।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, তদন্ত শেষে ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
মন্তব্য করুন