অনলাইন ডেস্ক
২০ জানুয়ারী ২০২৬, ৭:২৭ পূর্বাহ্ন
অনলাইন সংস্করণ

ইসলামের নবজাগরণে প্রয়োজন দূরদৃষ্টি ও সঠিক পরিকল্পনা

পৃথিবীতে আট’শ কোটির উপরে মানুষ। এর মধ্যে মাত্র সোয়া দুই’শ কোটি মুসলমান। এই সংখ্যা শুধুমাত্র মৌলবাদী বা প্র্যাক্টিসিং মুসলিমের না। বরং শিয়া-সুন্নি, খারেজি-ওয়াহাবি, মৌলবাদী-মডারেট, ফাসেক-ফাজের সালাফি-আহলে হাদিস, দেওবন্দি ও অন্যান্য ঘরানার সব মিলিয়ে। আজও বিশ্বে খ্রিস্ট ধর্মাবলম্বীর সংখ্যা সবচে বেশি।

অনুসারীর সংখ্যার বিবেচনায় দ্বিতীয় পর্যায়ে আছে ইসলাম। বিশ্বে স্বাধীন দেশ আছে প্রায় দুই’শ। এর মধ্য থেকে একটিও পূর্ণাঙ্গ ইসলামী রাষ্ট্র নেই। মাত্র পঞ্চাশটি দেশে মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠ। অর্থাৎ মোট জনগোষ্ঠির ৫০% এর বেশি মুসলমান।

এই দেশগুলোর বেশির ভাগই আবার আয়তনে খুবই ক্ষুদ্র। খেলাফত আমলে যেগুলো ছিল একেকটি গ্রামের পর্যায়ে। এইযে ছয়’শ কোটি মানুষ অমুসলিম; তাদের দেশ, পরিচয়, ধর্ম, দর্শন, ভিন্ন ভিন্ন হলেও ইসলাম বিরোধিতায় বা ইসলামকে নির্মূলে তারা সবাই কিন্তু এক ও অভিন্ন। আল্লাহর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘গোটা কুফুরি শক্তি এক জাতি ভুক্ত’।

ফিলিস্তিনের ভূখণ্ড গ্রাস করেছে ইসরাইল। আল আকসাও তাদের দখলে। কাশ্মীর জ¦লছে যুগের পর যুগ। আরাকানে জাতিগত উচ্ছেদ হয়েছে। উইঘুরে মুসলমানরা নির্যাতিত হচ্ছে। এভাবে বিশ্বের সর্বত্রই আমরা বহিঃশত্রু দ্বারা আক্রান্ত।

এই যখন অবস্থা, তখনও আমরা নিজেদের মাঝে পরস্পরে মারামারি, বিরোধ, কাঁদা ছোড়াছুড়ি, ভুল ধরাধরি, সমালোচনা, অ্যাটাক, কাউন্টার অ্যাটাক, দলবাজি, মুখোশ উন্মোচন ইত্যাদি মানসিক সঙ্কীর্ণতায় লিপ্ত। শত্রুর কি অভাব পড়েছে ভাই? এতো এতো শত্রু রেখে ঘরের মানুষকে পর করার চেষ্টায় কেন আমরা নিজেদের শক্তি ক্ষয় করছি।

আপনার নজর যদি থাকে সঠিক প্রতিপক্ষ, বড় শত্রু ও ইসলামের বাইরের দুশমনের দিকে, তাহলে দেখবেন ‘মুসলমান’ শব্দটা বলা যায় যাদের ক্ষেত্রে, তাদের সাথে আপনার মতভেদ আছে; কিন্তু শত্রুতা নেই। চিন্তার ভিন্নতা আছে; তবে বিভেদ নেই। কারণ মতভিন্নতার পরেও এরা সবাই মুসলমান। সবারই সামনে রয়েছে কমন এক বৃহৎ শত্রুগোষ্ঠি।

কেমনে নির্ণয় করবেন, আপনার আসল প্রতিপক্ষ কে? কায়দা বলে, ‘বিপরীত জিনিস দ্বারা একটি জিনিসের সঠিক পরিচয় নির্ণিত হয়’ (تعرف الأشياء بأضدادها)। ইসলামের বিপরীত শব্দ কুফুর। তাওহিদের বিপরীত শব্দ শিরিক। অতএব যে কুফুর বা শিরিকের শিবিরে আছে সেই একজন মুসলমানের প্রকৃত প্রতিপক্ষ।

যারা কাফের বা মুশরিক না, তাদের সাথে কোনো বিষয়ে আপনার মতভিন্নতা থাকতে পারে। কিন্তু ইসলাম ও তাহিদের প্রশ্নে তারা আপনার মূল প্রতিপক্ষ নয়। কুফুর ও শিরকের পর্যায়ের শত্রুতা বা ঘৃণা ওই ব্যক্তির সাথে রাখা যাবে না, যে কাফের বা মুশরিক নয়।

আপনি যখন নির্ণয় করতে পারবেন আপনার প্রধান প্রতিপক্ষ কে, তখন আপনার শক্তি, আপনার শত্রুতা সব জমা থাকবে এবং প্রয়োজনে ব্যবহৃত হবে শুধু সেই প্রধান প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে। আপনার দেশের বাইরের শত্রুর ব্যাপারে যদি সঠিক জ্ঞান থাকে, তাহলে দেশের নাগরিক সবাইকেই বন্ধু মনে হবে। জ্ঞান বল, অস্ত্র বল ও অর্থ বলের ব্যবহার হবে কেবল মুসলিমদের বিরুদ্ধে সক্রিয় অমুসলিমদের বিনাশে।

নিজেদের পরস্পরের বিরুদ্ধে এসব অস্ত্র ব্যবহার করে শক্তির ক্ষয় হবে না। কুদস বিজেতা সুলতান সালাহুদ্দিন আইয়ুবি রহ. সবসময় বলতেন, ‘আমি আমার যাবতীয় শক্তি ও শত্রুতা সঞ্চয় করে রাখতে চাই ক্রুসেডারদের জন্য।’ এজন্য তিনি কোনো মুসলিম ফেরকার বিরুদ্ধে অস্ত্র ধরতেন না। এটাকে শক্তির অপচয় মনে করতেন।

আসল শত্রু ও প্রধান প্রতিপক্ষ নির্ণয় করতে না পারার ফলাফল কী হয়, তা ওঠে এসেছে জাহেলি যুগেরচিত্র সম্বলিত একটি কবিতায়। কবি বলেন, أحيانا على بكر أخينا، إذا لم نجد إلا أخانا ‘আমাদের শত্রুতার নেশা, রক্ত পিপাসা এবং বিরোধিতার প্রবণতা এমন পর্যায়ে গিয়েছিল যে, সামনে কোনো শত্রু না থাকলে স্বগোত্রীয় ভাইদেরকেই দুটি পক্ষ বানিয়ে যুদ্ধের পিপাসা নিবারণ করতাম’।

আরও পড়ুন  বাংলাদেশের নির্বাচন নিয়ে ভারত মতামত দেওয়ার অধিকার রাখে না : রিজওয়ানা

আগুন সবসময় জ্বলানি চায়। পোড়ার জন্য। ভস্ম করার জন্য। জ¦ালানি না পেলে আগুন নিজেকেই জ¦ালানি বানিয়ে পুড়তে থাকে। فالنار تأكل بعضه إن لم تجد ما تأكله ‘মনের উপনিবেশ মনের মুক্তি’ বইয়ে মুসা আল হাফিজ এর এক বক্তব্যেও বিষয়টি ওঠে এসেছে। তিনি বলেন, ‘ক্ষমতা এবং শক্তি সবসময় প্রতিপক্ষ চায়। সে চায় পৃথিবীতে কৃত্রিমভাবে হলেও উত্তেজনা জিইয়ে রাখতে। আর উত্তেজনা সৃষ্টির জন্য প্রয়োজন প্রতিপক্ষ। তাই সে কাউকে না কাউকে প্রতিপক্ষ হিসেবে দাঁড় করায়। প্রতিপক্ষ না পেলে ছায়ার সাথে যুদ্ধ করে। যুদ্ধ ও শক্তিবাজি সাম্রাজ্যবাদের রুটিন কর্মসূচি।’

তো মূলত দেখার বিষয়, আপনার নজর এবং দৃষ্টি। আপনার নজরটা কোথায়? কাছে নাকি দূরে? আপনি দূরদৃষ্টিসম্পন্ন নাকি সংকীর্ণ দৃষ্টির মানুষ? ইসলামের বাইরের মূল প্রতিপক্ষের দিকে যদি আপনার নজর থাকে, তার আক্রমণ ও অনিষ্টতার ব্যাপারে যদি আপনার ধারণা থাকে, তাহলে দেখবেন, নিজেদের পারস্পরিক ভেদাভেদ দূর হয়ে গেছে।

বৃহৎ শত্রুর মোকাবিলায় নিজেদের মতভিন্নতাকে তুচ্ছ ও নস্যি মনে হচ্ছে। عند الحفيظة تذهب الأحقاد পিঠ বাঁচানোর প্রয়োজন দেখা দিলে নিজেদের মধ্যকার শত্রুতা দূর হয়ে যায়। তখন ঐক্যবদ্ধ হয়ে শত্রুর মোকাবিলাই মুখ্য হয়ে ওঠে। বিপদাপদ বিপদগ্রস্তদের এক কাতারে দাঁড় করায়। إن المصائب تجمع المصابين। তবে বিপদ চলে আসার আগেই বিপদগ্রস্ততার অনুভূতি নিয়ে যারা ঐক্যবদ্ধ থাকতে পারে বা ঐক্যবদ্ধ থেকে বিপদ মোকাবিলা করে; তারাই তো প্রকৃত বুদ্ধিমান।

আমরা এখন একটি যুগসন্ধি কালে অবস্থান করছি। এই সময়ে আমাদের সামনের পথচলা খুবই সুচিন্তিত ও পরিকল্পিত হওয়া চাই। ন্যায় প্রতিষ্ঠা ও অন্যায়ের প্রতিরোধে এমন কর্মপন্থা গ্রহণ করা চাই, যার কারণে পরবর্তীতে আর মানুষকে জুলুম-নিপীড়ন ও বঞ্চনার শিকার হতে না হয়।

এদেশ সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমানের দেশ বটে। লেবাসে-পোশাকে কিংবা বংশপরিচয়ে মুসলমানের সংখ্যা অনেক হলেও ধর্মের জন্য নিবেদিত প্রাণ এবং ঈমানী শক্তিতে বলীয়ান মুমিনের সংখ্যা খুবই কম। আবেগী মানুষ বেশি। বিবেকবান কম। যেকোনো ইস্যুতে স্লোগান প্রদান আর মাঠ গরম করার লোকের অভাব পড়বে না।

কিন্তু প্রতিকূলতার সময়ে বুক টান করে সীসা ঢালা প্রাচীরের মত অটল ও অবিচল থাকার মত নির্ভীক দুঃসাহসী লোক খোঁজে পাওয়া যাবে না। তাই নিজের সক্ষমতা সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা নিয়েই অগ্রসর হতে হবে। قدر لرجلك قبل الخطو موضعها + فمن علا زلقا عن غر زلج. ‘কদম ফেলার আগে পায়ের নিচের মাটি সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা নাও, কারণ পিচ্ছিল পথ বেয়ে ওপরে ওঠার ক্ষেত্রে যে অন্যমনস্ক থাকে সে আছাড় খায়।’ অতএব বুঝেশুনে খুব সতর্কতার সাথে কদম বাড়াতে হবে।

বিজাতীয় সংস্কৃতি, পশ্চিমা প্রভাব ও ওরিয়েন্টালিজমের অব্যাহত প্রচার-প্রচারণার কারণে মানুষ ইসলামী মৌল বিশ্বাস এবং চেতনা থেকে দূরে সরে গেছে অনেক। এরসাথে যুক্ত হয়েছে জাগতিক মোহ, ক্ষমতার প্রভাব। এতদূর থেকে ইচ্ছা করলেই জাতিকে এক লাফে পূর্ণাঙ্গ ইসলাম বা ইসলামের তাকওয়ার স্তরে প্রবেশ করানো সম্ভব নয়।

এর জন্য সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। সাধারণ-বিশেষ সর্বশ্রেণির মধ্যে ইসলামী জাগরণ সৃষ্টি করতে হবে। এই উদ্দেশ্যে ৫০ বছরের কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। ভিশন ঘোষণা করতে হবে।

এসব বিষয়ের সাথে জনসম্পৃক্ততা বাড়াতে হবে। মক্কা বিজয়ের মতো ‘ফাতহে মুবিন’ এর পরিবেশ তৈরি করতে হবে। সারাবিশ্বেই মুসলিমদের মাঝে আজ আদর্শ নেতৃত্বের খরা চলছে। তাদের সামনে কোনো নেতা নেই। নেই কোনো দরদি অভিভাবক। নেই সুপরিকল্পিত লিডারশীপ। ফলে রাখালবিহীন বিরাট ভেড়ার পাল থেকে সিংহের বা বাঘের নির্বিঘ্নে শিকার বধ করার মতই প্রতিপক্ষরা মুসলমানদেরকে একে একে ঘায়েল করছে।

Facebook Comments Box

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

জাহাজ আটকের ঘটনায় যুক্তরাষ্ট্রের ‘অবৈধ ও বর্বর’ পদক্ষেপের জন্য জাতিসংঘে অভিযোগ ইরানের

ভাসানচরকে সন্দ্বীপের অন্তর্ভুক্ত করতে ভূমি মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে হাইকোর্টের রুল

শুরু হলো এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষা

তেল-গ্যাস সংকটে যেন কেউ সিন্ডিকেট করতে না পারে, তা নিশ্চিত করবে সরকার: রিজভী

কাল থেকে শুরু এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষা, অংশ নেবে সাড়ে ১৮ লাখ শিক্ষার্থী

পাচারকৃত অর্থ ফিরিয়ে এনে কৃষক-ফ্যামিলি কার্ডের মাধ্যমে জনগণকে দেওয়া হবে

সন্ধ্যার মধ্যে চার অঞ্চলে ৬০ কিমি বেগে বজ্রবৃষ্টির আভাস

বিগত স্বৈরাচার ও অন্তর্বর্তীকালীন সরকার বাচ্চাদের জন্য টিকা আনেনি: প্রধানমন্ত্রী

হাম ও হামের উপসর্গে আরও ৫ শিশুর মৃত্যু

দেশে এপ্রিল-মে মাসের পূর্ণ জ্বালানি সক্ষমতা রয়েছে: জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী

১০

রাশিয়ার জ্বালানি আমদানিতে বাংলাদেশকে আরও ৬০ দিনের ছাড় দিলো যুক্তরাষ্ট্র

১১

জামালপুরে কারাগারে আওয়ামী লীগ নেতার মৃত্যু

১২

জাতীয় সংকট উত্তরণে ঐক্যবদ্ধ হয়ে কাজ করার আহ্বান জামায়াত আমিরের

১৩

রাজধানীর গুলশানে সিসাবারে অভিযান, সেবন সামগ্রী জব্দ

১৪

শুক্রবার রাজধানীর যেসব মার্কেট বন্ধ থাকবে

১৫

ঐতিহাসিক মুজিবনগর দিবস আজ

১৬

সংরক্ষিত আসনের প্রার্থী বিএনপির শহিদ পরিবারের সদস্য ছাত্রদলের শারমিন সুলতানা রুমা

১৭

পহেলা বৈশাখ আমাদের জাতিসত্তার ইতিহাস, সংস্কৃতি ও আত্মপরিচয়ের এক অনন্য প্রতীক

১৮

মানবাধিকার কমিশনের সব সদস্যের পদত্যাগ

১৯

বিদ্যুতের দাম সমন্বয়ে মন্ত্রিসভা কমিটি গঠন

২০