
জামালপুরে বিএনপি প্রার্থীর পক্ষে ভোট চাইলেন হত্যা ও নাশকতা মামলার এজাহার ভুক্ত আসামি বাবু চেয়ারম্যান,
অভিযোগ ঘিরে বিতর্ক, সামাজিক মাধ্যমে উত্তেজনা
জামালপুরের বকশীগঞ্জ উপজেলায় একাধিক মামলা সংশ্লিষ্ট একজন স্থানীয় জনপ্রতিনিধির বিএনপির নির্বাচনী প্রতীক ধানের শীষে ভোট দেওয়ার আহ্বানকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা-সমালোচনা তৈরি হয়েছে। বিষয়টি সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর বিভিন্ন দল ও সংগঠনের নেতাদের মধ্যে পাল্টাপাল্টি প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে।
অভিযোগ রয়েছে, বকশীগঞ্জ উপজেলার সাধুরপাড়া ইউনিয়নের বহিষ্কৃত চেয়ারম্যান মাহমুদুল হাসান বাবু সম্প্রতি ৩ ফেব্রুয়ারি রাতে একটি কেন্দ্রে কাছাকাছি গিয়ে ধানের শীষ প্রতীকে ভোট দেওয়ার আহ্বান জানান। তার বক্তব্যের ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হলে বিষয়টি স্থানীয় রাজনীতিতে আলোচনার জন্ম দেয়। বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়, তিনি হত্যা ও নাশকতা মামলার এজাহারভুক্ত আসামি হিসেবে তালিকাভুক্ত রয়েছেন।
তবে এসব মামলার বিষয়ে আদালতের চূড়ান্ত রায় এখনো হয়নি।
এ ঘটনার প্রতিবাদ জানিয়ে বকশীগঞ্জ পৌর জামায়াতে ইসলামী নেতা রাশেদুল ইসলাম রাশেদী, তার ব্যক্তিগত ফেসবুক পোস্টে লেখেন, “১২ তারিখে জনগণ ভোটের মাধ্যমেই বিএনপিকে লাল কার্ড দেখাবে।”
মেরুরচর ইউনিয়ন জামায়াতে ইসলামীর সভাপতি মাওলানা মিজানুর রহমান বলেন, “হত্যা ও নাশকতা মামলার এজাহারভুক্ত একজন ব্যক্তি কীভাবে প্রকাশ্যে নির্বাচনী প্রচারণা চালান—এ বিষয়ে প্রশাসনের নজর দেওয়া প্রয়োজন।” তিনি প্রশাসনের হস্তক্ষেপ ও দ্রুত আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান।
অন্যদিকে গণঅধিকার পরিষদের এক স্থানীয় নেতা ও বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত এক ছাত্রনেতা তার ফেসবুক পোস্টে তীব্র প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন। তার পোস্টে সহিংসতার ইঙ্গিতপূর্ণ ভাষা ব্যবহৃত হওয়ায় বিষয়টি নিয়েও সামাজিক মাধ্যমে আলোচনা শুরু হয়েছে।
বকশীগঞ্জ উপজেলা পরিষদের আহ্বায়ক শাহরিয়ার আহমেদ সুমন তার ব্যক্তিগত ফেসবুক পোস্টে লেখেন, “হত্যা ও নাশকতার মামলার আসামি কীভাবে প্রকাশ্যে ভোট প্রার্থনা করছেন—প্রশাসনের বিষয়টি গুরুত্বসহকারে দেখা উচিত।”
নাদিম হত্যা মামলার প্রসঙ্গ:
এদিকে স্থানীয়ভাবে আলোচিত আরেকটি বিষয় হলো সাংবাদিক গোলাম রব্বানী নাদিম হত্যাকাণ্ড। ৭১ টিভির বকশীগঞ্জ প্রতিনিধি গোলাম রব্বানী নাদিমের ওপর হামলার ঘটনায় দায়ের করা হত্যা মামলায় মাহমুদুল হাসান বাবু প্রধান আসামি হিসেবে এজাহারে অন্তর্ভুক্ত রয়েছেন বলে স্থানীয় সূত্রে জানা যায়।
মামলার অভিযোগ অনুযায়ী, বকশীগঞ্জের পানহাটি মোড়ে রাতে বাবু চেয়ারম্যান এর নেতৃত্বে তার নেতা কর্মীদের হামলায় গুরুতর আহত হন সাংবাদিক নাদিম। পরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। ঘটনাটি দেশজুড়ে আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। তবে মামলাটি বিচারাধীন থাকায় অভিযুক্তদের বিষয়ে আদালতের রায় না হওয়া পর্যন্ত বিষয়টি অভিযোগ হিসেবেই বিবেচিত হবে।
স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, মাহমুদুল হাসান বাবুর রাজনৈতিক অতীত নিয়েও আলোচনা রয়েছে। তিনি ছাত্র রাজনীতির মাধ্যমে রাজনীতিতে যুক্ত হন এবং পরবর্তীতে যুবলীগ ও ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন বলে বিভিন্ন মহলে দাবি করা হয়। সাম্প্রতিক সময়ে দায়ের হওয়া একটি নাশকতা মামলাতেও তার নাম এজাহারে রয়েছে বলে জানা যায়।
বিএনপি প্রার্থীকে ঘিরে অভিযোগ
জামায়াতে ইসলামীর কয়েকজন নেতা অভিযোগ করে বলেন, বিতর্কিত এসব ব্যক্তির নির্বাচনী মাঠে সক্রিয় থাকার পেছনে রাজনৈতিক ‘শেল্টার’ রয়েছে। তাদের দাবি, জামালপুর-১ আসনের বিএনপির মনোনীত প্রার্থী এম. রশিদুজ্জামান মিল্লাতের আশ্রয়–প্রশ্রয়ে তারা মাঠে রয়েছেন। তবে এ অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট প্রার্থীর কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিও বক্তব্যে এম. রশিদুজ্জামান মিল্লাতকে উদ্ধৃত করে বলা হয়, তিনি নির্বাচনী প্রচারণায় বলেছেন— “যারা আওয়ামী লীগ করেন, তারা আমাদের দলে যোগ দিতে পারেন।” একই বক্তব্যে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সংক্রান্ত মন্তব্যও রয়েছে বলে দাবি করা হচ্ছে। তবে ভিডিওটির সত্যতা ও প্রেক্ষাপট স্বাধীনভাবে যাচাই করা হচ্ছে।
প্রশাসনের অবস্থান:
প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত এ বিষয়ে স্থানীয় প্রশাসনের কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, নির্বাচন ঘনিয়ে আসার প্রেক্ষাপটে সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিও, পুরোনো মামলা ও রাজনৈতিক পাল্টাপাল্টি অভিযোগ পরিস্থিতিকে আরও সংবেদনশীল করে তুলছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে দায়িত্বশীল আচরণ ও যাচাই-বাছাই জরুরি বলে তারা মনে করেন।
মন্তব্য করুন