
রমজান মাসজুড়ে স্কুল বন্ধ রাখতে হাইকোর্টের নির্দেশ
শিক্ষা কার্যক্রম, সংবিধান ও ধর্মীয় অনুশীলন নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ
সামরুল হক, জামালপুর প্রতিনিধি:
পবিত্র রমজান মাসে দেশের সরকারি ও বেসরকারি নিম্ন মাধ্যমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখতে নির্দেশ দিয়েছেন বাংলাদেশ হাইকোর্ট। রোববার (১৫ ফেব্রুয়ারি) বিচারপতি ফাহমিদা ও বিচারপতি মো. আসিফ হাসানের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ এ আদেশ প্রদান করেন। আদালতের এ সিদ্ধান্তকে ঘিরে শিক্ষা অঙ্গন, অভিভাবক মহল ও সচেতন নাগরিকদের মধ্যে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে।
রিট দায়েরের পটভূমি:
পুরো রমজান মাসে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখার নির্দেশনা চেয়ে হাইকোর্টে একটি রিট আবেদন দায়ের করা হয়। রিটটি করেন বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট-এর আইনজীবী মো. ইলিয়াছ আলী মন্ডল।
গত ৫ জানুয়ারি তিনি সরকারকে একটি আইনি নোটিশ পাঠান, যাতে রমজান মাসে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয় খোলা না রাখার অনুরোধ জানানো হয়। নোটিশটি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সচিব এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সচিবের কাছে প্রেরণ করা হয়। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে নোটিশের কোনো জবাব না পাওয়ায় তিনি সংবিধানিক প্রতিকার চেয়ে হাইকোর্টে রিট দায়ের করেন।
সংবিধান ও প্রথার যুক্তি:
রিট আবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশের প্রায় ৯৮ শতাংশ জনগণ মুসলমান এবং স্বাধীনতার পর থেকে রমজান মাসে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখার একটি প্রথা চালু রয়েছে। এই প্রথা দীর্ঘদিনের চর্চার মাধ্যমে একটি নীতিগত অবস্থানে পরিণত হয়েছে বলে দাবি করা হয়।
সংবিধানের ৩১ অনুচ্ছেদে আইনের শাসনের কথা উল্লেখ করে বলা হয়— আইন ছাড়া কোনো কিছু করা যাবে না। এছাড়া ১৫২(১) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী ‘আইন’ বলতে কেবল প্রণীত আইনই নয়, বরং দেশে বলবৎ থাকা প্রথা ও রীতিকেও বোঝায়। সেই আলোকে রমজান মাসে বিদ্যালয় খোলা রাখার সিদ্ধান্ত অসাংবিধানিক— এমন যুক্তি উপস্থাপন করা হয়।
শিক্ষার্থীদের শারীরিক ও মানসিক বিষয়:
রিটে আরও বলা হয়, প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের কোমলমতি শিক্ষার্থীরা সারাদিন স্কুলে যাতায়াত ও শ্রেণিকক্ষে অংশগ্রহণ করে শারীরিকভাবে ক্লান্ত হয়ে পড়ে। রোজা পালনরত শিক্ষার্থীদের জন্য দীর্ঘ সময় স্কুলে অবস্থান কষ্টসাধ্য হয়ে দাঁড়াতে পারে। এতে তাদের ধর্মীয় অনুশীলনে বিঘ্ন ঘটার আশঙ্কা রয়েছে।
এছাড়া রমজান মাসে শহরাঞ্চলে যানজটের মাত্রা বেড়ে যাওয়ার বিষয়টিও উল্লেখ করা হয়। স্কুল খোলা থাকলে শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও সাধারণ মানুষের চলাচল বেড়ে যায়, ফলে সেহরি ও ইফতারের সময় নাগরিক দুর্ভোগ বাড়তে পারে— এমন যুক্তিও আদালতে উপস্থাপন করা হয়।
আদালতের পর্যবেক্ষণ ও নির্দেশনা:
শুনানি শেষে হাইকোর্ট সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দেন— পবিত্র রমজান মাসজুড়ে সরকারি ও বেসরকারি নিম্ন মাধ্যমিক এবং মাধ্যমিক বিদ্যালয় বন্ধ রাখতে হবে। আদালতের এ নির্দেশনার ফলে শিক্ষা প্রশাসনে নতুন করে একাডেমিক ক্যালেন্ডার পুনর্বিন্যাসের প্রয়োজন হতে পারে।
সংশ্লিষ্ট মহলের মতে, আদালতের আদেশ কার্যকর করতে হলে শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে আনুষ্ঠানিক প্রজ্ঞাপন জারি করা হবে এবং সে অনুযায়ী বিদ্যালয়গুলোতে নির্দেশনা পাঠানো হবে।
সম্ভাব্য প্রভাব ও প্রতিক্রিয়া:
এই নির্দেশনার ফলে রমজান মাসে শিক্ষার্থীরা পূর্ণ সময় ধর্মীয় অনুশীলন, পারিবারিক সময় ও বিশ্রামের সুযোগ পাবে— এমন আশা প্রকাশ করেছেন অনেক অভিভাবক। তবে শিক্ষা কার্যক্রমে ধারাবাহিকতা বজায় রাখা, বার্ষিক পাঠসূচি ও পরীক্ষা সূচি সমন্বয় করা— এসব বিষয় নিয়েও আলোচনা শুরু হয়েছে।
শিক্ষা বিশ্লেষকদের মতে, আদালতের নির্দেশ বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে শিক্ষাবর্ষের সময়সূচি পুনর্নির্ধারণ, ছুটির পুনর্বিন্যাস এবং পরীক্ষার তারিখ পুনঃনির্ধারণ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
উপসংহার:
রমজান মাসকে ঘিরে শিক্ষা কার্যক্রমের এই গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত দেশের বিচার বিভাগ, শিক্ষা প্রশাসন ও ধর্মীয় অনুশীলনের সমন্বয় নিয়ে নতুন এক দৃষ্টান্ত স্থাপন করল। এখন সবার দৃষ্টি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের আনুষ্ঠানিক প্রজ্ঞাপন ও বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ার দিকে।
মন্তব্য করুন