
বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া আর নেই। মৃত্যুর মধ্য দিয়ে তিনি তার বণার্ঢ্য রাজনীতির ইতি টানলেন।
খালেদা জিয়া তার রাজনৈতিক জীবনে দুইবার জেল কেটেছেন এবং পাঁচবার গ্রেফতার হয়েছেন। এর মধ্যে এরশাদবিরোধী আন্দোলনে তিনবার গ্রেফতার হন। তবে কারাগারে যেতে হয়নি।
এক-এগারোর সময় ২০০৭ সালের সেপ্টেম্বরে গ্রেফতার হয়ে প্রথমবারের মতো কারাগারে যান বিএনপি নেত্রী। এরপর ২০১৮ সালের ফেব্রুয়ারিতে আবার কারাগারে যান খালেদা জিয়া।
এরশাদবিরোধী আন্দোলন ও গ্রেফতার
দলের জ্যেষ্ঠ নেতাদের অনুরোধে রাজনীতিতে এসে শুরুতেই নিজের জাত চিনিয়েছেন খালেদা জিয়া। স্বৈরাচারবিরোধী লড়াইয়ে আপসহীন নেত্রীর তকমা পান। তবে সেই পথ মসৃণ ছিল না কোনোভাবেই।
১৯৮৩ সালের ২৮ নভেম্বর, ১৯৮৪ সালের ৩ মে এবং ১৯৮৭ সালের ১১ নভেম্বর— হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের আমলে তিনবার গ্রেফতার হয়েছিলেন বিএনপি চেয়ারপারসন। তবে তাকে দীর্ঘ সময় আটকে রাখা সম্ভব হয়নি।
গ্রেফতার হয়ে প্রথমবারের মতো কারাগারে
এক-এগারোর রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ২০০৭ সালের ৩ সেপ্টেম্বর সেনানিবাসের মইনুল রোডের বাসভবন থেকে খালেদা জিয়াকে গ্রেফতার করা হয়। সে সময় তাকে জাতীয় সংসদ ভবন এলাকায় স্থাপিত বিশেষ সাবজেলে বন্দি রাখা হয়। সেই সময় তার দুই ছেলে তারেক রহমান ও আরাফাত রহমান কোকোও কারাবন্দি ছিলেন।
প্রায় ৩৭২ দিন বন্দি থাকার পর ২০০৮ সালের ১১ সেপ্টেম্বর জামিনে মুক্তি পান খালেদা জিয়া।
সাজা ও নাজিমুদ্দিন রোডের কারাগারে
২০১৮ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলায় সাজা হলে খালেদা জিয়াকে রাখা হয় নাজিমুদ্দিন রোডের পরিত্যক্ত পুরোনো কেন্দ্রীয় কারাগারে। পরে জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায়ও সাজা হয়।
পরিত্যক্ত বিশাল এই কারাগারের স্যাঁতসেঁতে পরিবেশে তার স্বাস্থ্যের দ্রুত অবনতি ঘটে।
করোনা মহামারির সময় ২০২০ সালের ২৫ মার্চ শর্ত সাপেক্ষে নির্বাহী আদেশে সাজা স্থগিত করে সরকার এবং বাসায় থাকার অনুমতি দেয়।
এরপর গুলশানের ফিরোজায় থাকলেও সেটি ছিল মূলত একধরনের গৃহবন্দিত্ব। সেখানে বাইরের কারও সঙ্গে দেখা করার সুযোগ ছিল অত্যন্ত সীমিত।
নিবার্হী আদেশে মুক্তির পর থেকে ৬ মাস পরপর ধাপে ধাপে তার মুক্তির মেয়াদ বাড়ানো হয়। এর মধ্যে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের আগ পর্যন্ত খালেদা জিয়া হাসপাতালে ভর্তি হন একাধিকবার। তখন তার পরিবারের পক্ষ থেকে আবেদন করা হয়েছিল বিদেশে নিয়ে গিয়ে চিকিৎসা করানোর বিষয়ে। কিন্তু সেই আবেদন প্রত্যাখ্যান হয়।
৫ আগস্টে গণঅভ্যুত্থানের পরদিন সাজা থেকে পুরোপুরি মুক্তি পান খালেদা জিয়া।
আন্তর্জাতিক ও দেশীয় আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ছিল। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালও বিচারের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে।
বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুলও একই মত দেন, মামলা ও রায় ছিল উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।
মামলা
জিয়া অরফানেজ ও জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলা ছাড়া আরও তিনটি দুর্নীতি মামলা দায়ের হয়েছিল খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে। সেগুলো হচ্ছে নাইকো, গ্যাটকো ও বড় পুকুরিয়া কয়লা খনি দুর্নীতি মামলা।
নাইকো দুর্নীতি মামলা
কানাডার জ্বালানি কোম্পানি নাইকোর সঙ্গে গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনের চুক্তি করে রাষ্ট্রের প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা ক্ষতি করার অভিযোগে ২০০৮ সালে সেনা-সমর্থিত সরকারের সময়ে এই মামলাটি হয়।
মামলায় শেখ হাসিনাকেও আসামি করা হয়েছিল, কারণ ১৯৯৬ সালে যখন তিনি প্রধানমন্ত্রী ছিলেন, তখন এই চুক্তিটি প্রথম করা হয়েছিল।
২০০৯ সালে ক্ষমতায় আসার পর আদালত শেখ হাসিনাকে এই মামলা থেকে অব্যাহতি দেয়। কিন্তু মামলাটি রয়ে যায় এবং আসামি হিসাবে থেকে যান খালেদা জিয়া।
চলতি বছরে এই মামলায় বিচারিক আদালত থেকে খালাস পান তিনি।
গ্যাটকো দুর্নীতি মামলা
ঢাকার কমলাপুরে কনটেইনার টার্মিনাল নির্মাণের কাজ যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ না করে গ্যাটকো নামে একটি কোম্পানিকে দেয়ার অভিযোগে এই মামলাটিও হয় এক-এগারোর সেনা-সমর্থিত সরকারের সময়। গত বছর অভিযোগ গঠনের শুনানির সময় এই মামলা থেকে অব্যাহতি পান খালেদা জিয়া।
বড় পুকুরিয়া কয়লা খনি দুর্নীতি মামলা
খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে এই মামলাটিও করা হয় ২০০৮ সালে। গতবছর মামলাটি থেকে অব্যাহতি পান তিনি।
এই মামলার অভিযোগ ছিল, চুক্তিবদ্ধ কোম্পানি শর্ত ভেঙে সরকারের চোখের সামনে অতিরিক্ত এলাকায় কয়লা খনন করে রাষ্ট্রের ক্ষতি করেছে এবং খালেদা জিয়া রাষ্ট্রের স্বার্থ রক্ষায় ব্যর্থ হয়েছেন।
মানহানি ও নাশকতার মামলা
দুর্নীতির পাঁচ মামলা ছাড়াও খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে আরও ৩২টি মামলার তথ্য জানা যায় ৫ আগস্টের পর। যার মধ্যে বেশিরভাগ মামলা খারিজ হওয়ার তথ্য গত বছরের নভেম্বরে জানিয়েছিলেন বিএনপিপন্থী আইনজীবীরা।
মন্তব্য করুন