
ভোটের ‘কৌশল লুট’-এর অভিযোগ তুলে কেন্দ্রকে কাঠগড়ায় তুললেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। বৃহস্পতিবার (৮ জানুয়ারি) সকাল থেকে দেশের কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট (ইডি) কলকাতার দুটি বেসরকারি সংস্থা—আইপ্যাক-এর অফিসে রুদ্ধশ্বাস অভিযান শুরু করে। এই দুই অফিসই তৃণমূল কংগ্রেসের তথ্য-প্রযুক্তি সেল হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে বলে দাবি করেন মুখ্যমন্ত্রী। সেখান থেকেই দলের গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্র লুট করার অভিযোগ তুলেছেন তিনি।
সকালে সল্টলেকে আইপ্যাকের দফতরে ইডি-র তল্লাশির মাঝেই ঘটনাস্থলে পৌঁছে যান মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। দুপুরে প্রায় ৪৫ মিনিট আইপ্যাকের দফতরে থাকার পর বেরিয়ে এসে তিনি অভিযোগ করেন, তার দলের নির্বাচনী কৌশল, হার্ডডিস্ক, ল্যাপটপ ও রাজনৈতিক নথি ‘ট্রান্সফার’ করে নিয়ে গেছে কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা। মুখ্যমন্ত্রীর দাবি, এই অভিযান ‘গণতন্ত্রের ওপর সরাসরি আঘাত’ এবং ‘একটি অপরাধ’।
বৃহস্পতিবার ভোর ৬টা নাগাদ শুরু হয় ইডি-র অভিযান। একই সঙ্গে তল্লাশি চলে আইপ্যাকের কর্ণধার প্রতীক জৈনের বাড়িতেও। তল্লাশি শুরু হওয়ার পর থেকেই আইপ্যাকের দফতর ঘিরে ফেলে কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা বাহিনী। পরে পরিস্থিতি সামাল দিতে বিধাননগর পুলিশ কমিশনারেটও এলাকায় অতিরিক্ত বাহিনী মোতায়েন করে। মুখ্যমন্ত্রী ঘটনাস্থলে পৌঁছনোর পর নিরাপত্তা আরও জোরদার করা হয়।
আইপ্যাক দফতরের বেসমেন্টে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে মমতা বলেন, ‘‘ওরা আমাদের ভোটের স্ট্র্যাটেজি ছিনতাই করেছে। পার্টির কাগজ, হার্ড ডিস্ক, অর্থনৈতিক নথি—সব লুট করেছে। লড়াই করার সাহস নেই বলেই এখন লুট করতে নেমেছে।’’
তিনি অভিযোগ করেন, রাজ্যে চলমান এসআইআর (Special Intensive Revision) সংক্রান্ত কাজের ডেটাও ফরেন্সিক টিমের মাধ্যমে ট্রান্সফার করা হয়েছে। মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্য, ‘‘এটা গণতন্ত্রে হতে পারে না। কোনো রাজনৈতিক দলের অফিসে ঢুকে এভাবে কাগজপত্র নেয়া যায় না।’’
এরপরই সরাসরি বিজেপির দিকে আঙুল তোলেন মুখ্যমন্ত্রী। তার মন্তব্য, ‘‘বিজেপির মতো এত বড় ডাকাত আমি জীবনে দেখিনি।’
তিনি প্রশ্ন তোলেন, ‘আমি যদি বিজেপির পার্টি অফিসে হানা দিই, সেটা কি ঠিক হবে?’’
এই ঘটনার প্রতিবাদে বিকেল থেকেই রাজ্যজুড়ে তৃণমূল কংগ্রেসের তরফে ব্লক ও ওয়ার্ড স্তরে প্রতিবাদ মিছিলের ডাক দেন মুখ্যমন্ত্রী।লাউডন স্ট্রিটে প্রতীক জৈনের বাড়িতে ইডি অভিযানের খবর পেয়ে সেখানেও পৌঁছন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। কয়েক মিনিটের মধ্যেই একটি সবুজ রঙের ফাইল হাতে বাড়ি থেকে বেরিয়ে এসে তিনি দাবি করেন, ‘‘ওরা আমার দলের সমস্ত নথিপত্র বাজেয়াপ্ত করছিল। আমি সেগুলো নিয়ে এসেছি।’’
সেখান থেকেই কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহকে নিশানা করে মমতার অভিযোগ, ‘‘উনি দেশ চালাতে পারছেন না। আমার দলের নথি বাজেয়াপ্ত করাচ্ছেন। প্রতীক আমার দলের ইনচার্জ। ওর ফোন, হার্ড ডিস্ক—সব নিয়ে নেয়া হচ্ছিল।”
এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক বিতর্ক তীব্র আকার নিয়েছে। পশ্চিমবঙ্গ বিজেপির নেতা শুভেন্দু অধিকারী বলেছেন, “উনি অতীতেও এমন করেছেন। রাজীব কুমারের বাড়িতে ইডি অভিযানের সময়ও একই কাণ্ড ঘটিয়েছিলেন। এটা সংবিধান লঙ্ঘন। উনি যাদের বাঁচাতে যান, তাদের বাড়িতে তল্লাশি হলে ১০০ কোটি টাকা পাওয়া যাবে।”
বামফ্রন্ট ও কংগ্রেসও মুখ্যমন্ত্রীর ভূমিকার সমালোচনা করেছে। তাদের বক্তব্য, একজন সাংবিধানিক পদাধিকারী হিসেবে মুখ্যমন্ত্রীর এভাবে কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থার অভিযানে হস্তক্ষেপ করা নজিরবিহীন এবং তা আইনের শাসনের পরিপন্থী।
এর আগেও কলকাতার প্রাক্তন পুলিশ কমিশনার রাজীব কুমারের বাড়িতে কেন্দ্রীয় সংস্থার অভিযানের সময় মুখ্যমন্ত্রীর সরাসরি উপস্থিতি ও নথি সরিয়ে আনার ঘটনা ঘিরে তুমুল বিতর্ক তৈরি হয়েছিল। বৃহস্পতিবারের এই অভিযানে সেই স্মৃতি মনে করিয়ে দিয়েছে।
রাজনৈতিক মহলের একাংশের মতে, লোকসভা ও বিধানসভা নির্বাচনের আগে এই ঘটনা রাজ্য–কেন্দ্র সংঘাতকে আরও তীব্র করবে। অন্যদিকে প্রশ্ন উঠছে—কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থার ভূমিকা এবং সাংবিধানিক সীমারেখা ঠিক কোথায় দাঁড়িয়ে? রাজনৈতিক মহল মনে করছে, এই ঘটনার রেশ দ্রুত কাটার নয়। কয়েক মাস পর রাজ্যে বিধানসভা নির্বাচন। তার আগেই এই বিতর্ক আরও বড় আকার নেবে বলেই ধারণা।
মন্তব্য করুন