
রংপুর অঞ্চলে হামের প্রকোপ বৃদ্ধি পেয়েছে। রংপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন চার শিশুর হাম নিশ্চিত হয়ে তাদের আইসোলেশন ওয়ার্ডে স্থানান্তর করা হয়েছে। এদিকে হাসপাতালে নিউমোনিয়া ও শ্বাসকষ্টজনিত রোগে আক্রান্ত হয়ে শতাধিক শিশু ভর্তি রয়েছে। গত তিন দিনে পাঁচ শিশু নিউমোনিয়া ও শ্বাসকষ্টজনিত রোগে আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছে।
রংপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আশিকুর রহমান হামে চার শিশু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসা নেওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
রংপুর অঞ্চলের বিভিন্ন জেলায় শিশুরা হাম রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। প্রাথমিকভাবে জ্বর, সর্দি, শ্বাসকষ্ট ও নিউমোনিয়া মনে হলেও আসলে হামে আক্রান্ত বলে চিকিৎসকরা জানিয়েছেন। রংপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে এসে ভর্তি হওয়া চার শিশু হামে আক্রান্ত বলে নিশ্চিত হওয়ার পর তাদের শিশু ওয়ার্ড থেকে আলাদা আইসোলেশন ওয়ার্ডে স্থানান্তর করা হয়েছে।
আক্রান্ত শিশুদের স্বজনরা বলছেন, প্রথমে প্রচণ্ড জ্বর আসে। তারপর শ্বাসকষ্ট শুরু হয়। এরপর আক্রান্ত শিশুরা জ্ঞান হারিয়ে ফেলে এবং শরীরে র্যাশ বের হয়। প্রথমে চিকিৎসকরা হাম কিনা ডিটেক্ট করতে পারেন না। তবে শরীর থেকে র্যাশ বের হলে তারা হাম বলে জানায়। আক্রান্ত চার শিশু এখন অনেকটা সুস্থ বলে জানিয়েছেন চিকিৎসকরা। তবে আশঙ্কা মুক্ত নয় বলে মনে করেন তারা।
সরেজমিন মঙ্গলবার (৩১ মার্চ) দুপুরে রংপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ডে ঘুরে দেখা গেছে, ওয়ার্ডে প্রবেশ পথের পাশে হামে আক্রান্ত রোগীদের জন্য আইসোলেশন ওয়ার্ড খোলা হয়েছে। সেখানে চার শিশুকে রেখে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।
কর্তব্যরত চিকিৎসক ডা. আশফাক জানান, হাম যেহেতু ছোঁয়াচে রোগ সে কারণে শিশু ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন অন্য শিশুদের সঙ্গে তাদের না রেখে আলাদা আইসোলেশন ওয়ার্ডে রাখা হয়েছে। আক্রান্ত শিশুদের ২৪ ঘণ্টা পরিচর্যা ও দেখভাল করা হচ্ছে।
দিনাজপুরের পার্বতীপুর থেকে আসা ব্যাংক কর্মকর্তা রঞ্জিত রায় জানান, ২৫ মার্চ তার দেড় বছরের শিশু প্রজ্ঞার হঠাৎ প্রচণ্ড জ্বর ও শ্বাসকষ্ট শুরু হলে স্থানীয় হাসপাতালে নেওয়া হলে জরুরি ভিত্তিতে রংপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে রেফার করা হয়। প্রথমে শিশু ওয়ার্ডে ভর্তি করা হলে শরীরের বিভিন্ন স্থানে র্যাশ বের হতে দেখে চিকিৎসকরা হামে আক্রান্ত হয়েছে জানিয়ে আইসোলেশন ওয়ার্ডে স্থানান্তর করে। দুই দিন আগে তার বাচ্চার হার্টে সমস্যা দেখা দেয়। জ্ঞান হারিয়ে ফেলে। চিকিৎসকদের তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ এবং যত্নের কারণে এখন কিছুটা সুস্থ আছে। তবে এখন শঙ্কামুক্ত নয় বলে জানিয়েছেন চিকিৎসকরা।
একই ভাবে হামে আক্রান্ত হয়ে ভর্তি হওয়া গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জের দুই বছরের শিশু আরাফাতের মা জয়নব বেগম জানান, তার ছেলের অবস্থা খুবই শোচনীয় ছিল। কয়েক দফা জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছিল। শনিবার থেকে ভর্তি আছে। এখন অবস্থা একটু উন্নতির দিকে।
লালমনিরহাট জেলা শহরের মিশন মোড় বালাটারি থেকে আসা ৮ মাসের শিশু আমাতুল্লা জান্নাতের বাবা আব্দুস সালাম জানান, পাঁচ দিন ধরে হামে আক্রান্ত শিশুর চিকিৎসা চলছে। শ্বাসকষ্ট কমছে না। চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, অবস্থা এখনও শঙ্কামুক্ত নয়।
রংপুরের ভুরারঘাট সিলিমপুর গ্রামের এক বছরের শিশু সাইয়ামকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে বলে জানান তার বাবা আইয়ুব আলী। তিনি জানান, তার বাচ্চা এখন অসুস্থ। তবে ৪ শিশু হামে আক্রান্ত হয়ে আইসোলেশন ওয়ার্ডে চিকিৎসা নিলেও তাদের বাচ্চাদের ভালোভাবে চিকিৎসা চলছে। স্বয়ং পরিচালক ও বড় বড় ডাক্তাররা এসে খোঁজ নেন।
তবে রংপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে আইসিইউ ওয়ার্ড মাত্র ১০ বেডের। হামে আক্রান্ত শিশুদের সিসিইউতে চিকিৎসা নেওয়া যেকোনও সময় প্রয়োজন হতে পারে। কিন্তু আইসিইউ আর সিসিইউতে বেড সংখ্যা বাড়ানো খুবই জরুরি বলে রোগীর স্বজনরা জানান।
অন্যদিকে হাসপাতালের ৯ ও ১০ নম্বর শিশু ওয়ার্ডে শ্বাসকষ্ট, জ্বর, সর্দি নিয়ে হাসপাতালে শতাধিক শিশু ভর্তি আছে। তাদের অনেকের অবস্থা আশঙ্কাজনক। গত তিন দিনে পাঁচ শিশু নিউমোনিয়াসহ শ্বাসকষ্টে মারা গেছে। তবে তাদের মধ্যে হামে আক্রান্ত শিশু ছিল কিনা তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
সার্বিক বিষয়ে রংপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আশিকুর রহমান জানান, হাম রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে। চার জনকে আইসোলেশন ওয়ার্ডে স্থানান্তর করা হয়েছে। তাদের চিকিৎসার সব ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। এখন পর্যন্ত বয়স্ক কেউ হামে আক্রান্ত হয়নি। তবে আক্রান্তদের জন্য আলাদা আইসোলেশন ওয়ার্ড খোলা হয়েছে। সেই সঙ্গে আইসিইউ সাপোর্টসহ সব ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
মন্তব্য করুন