
খুলনা প্রতিনিধি
ব্যাংকে মূল দলিল বন্ধক রেখে ঋণ গ্রহণের পর একই জমি পুনরায় বিক্রি করে কোটি কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে খুলনার রুপসা এলাকার মো. মিজানুর রহমান স্বপন ও তার স্ত্রী উম্মে হাবিবা লিমার বিরুদ্ধে। এ প্রতারণার শিকার হয়ে সর্বস্বান্ত হয়েছেন খুলনার ব্যবসায়ী আব্দুস সালাম।
ভুক্তভোগী সূত্রে জানা যায়, মো. মিজানুর রহমান স্বপন সাউথ বাংলা এগ্রিকালচার অ্যান্ড কমার্স ব্যাংক, খুলনা শাখায় জমির মূল দলিল বন্ধক রেখে কোটি টাকার ঋণ গ্রহণ করেন। পরবর্তীতে ব্যাংকের অজান্তে একই জমি নিজ স্ত্রীর নামে হেবা দলিল করে বাগেরহাট জেলার পিলজংগ মৌজার অন্তর্ভুক্ত জমি বিক্রির ফাঁদ পাতেন।
অভিযোগ অনুযায়ী, সি.এস খতিয়ান ১৬৯১, এস.এ খতিয়ান ১৫২১ এবং আর.এস খতিয়ান ৯৫৭ ও ১৭৬১-এর অন্তর্ভুক্ত দাগ নং ৪২১ ও ১১৭-এর মোট ৩৫ শতক জমি ২৩ জানুয়ারি ২০২৪ তারিখে আব্দুস সালামের কাছে বিক্রি করা হয়। জমিটির মূল্য নির্ধারণ করা হয় আড়াই কোটি টাকা। এর মধ্যে ৫০ লাখ টাকা দলিল খরচ বাবদ এবং ২ কোটি টাকা বায়না হিসেবে পরিশোধ করেন ক্রেতা।
এছাড়াও ব্যবসায়িক প্রয়োজনে আব্দুস সালামের কাছ থেকে চারটি চেক গ্রহণ করেন স্বপন। প্রতিটি চেকের মূল্য ৫ লাখ টাকা হলেও এর মধ্যে একটি চেক ভাঙিয়ে টাকা উত্তোলন করা হয় এবং বাকি তিনটি চেকে ঘষামাজা করে ৫ লাখের স্থলে ৫০ লাখ টাকা লেখা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। এ ঘটনায় আব্দুস সালাম বাগেরহাট নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে চেক জালিয়াতির মামলা দায়ের করেন (মিস পি-৪১/২৪)।
জমি ক্রয়ের পর দখল নিতে গেলে মিজানুর রহমান স্বপন বাধা প্রদান করেন। উল্টো আব্দুস সালাম, তার পুত্র এস এম আল নাহিয়ান ও আবুল কাশেমের বিরুদ্ধে বাগেরহাট অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে মিস মামলা নং ২৫০/২৪ দায়ের করেন তিনি। তদন্ত শেষে ফকিরহাট মডেল থানার পুলিশ অভিযোগের কোনো ভিত্তি নেই মর্মে প্রতিবেদন দাখিল করে।
তদন্তে আরও জানা যায়, উক্ত জমি বন্ধক রেখে নেওয়া ঋণ পরিশোধ না করায় স্বপনের বিরুদ্ধে অর্থ ঋণ আদালতে মামলা (নং ৬০/২০) দায়ের করেছে সংশ্লিষ্ট ব্যাংক। একের পর এক মামলা ব্যর্থ হওয়ায় স্বপন পরবর্তীতে একই আদালতে নতুন করে আরও দুটি মামলা দায়ের করেন।
নিরাপত্তাজনিত কারণে আব্দুস সালাম জমিটি নিজ পুত্র এস এম আল নাহিয়ানের নামে হেবা দলিল করে দিলে ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন স্বপন ও তার সহযোগীরা। অভিযোগ রয়েছে, স্বপনের ভায়রা ও স্থানীয় যুবলীগ নেতা মাসুম ওরফে গরু মাসুমের অনুসারীরা সাইনবোর্ড ও সীমানা ভেঙে দিয়ে ভয়ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে জমি দখলে নেয় এবং এক পর্যায়ে জোরপূর্বক এস এম আল নাহিয়ানকে উচ্ছেদ করে।
এ ঘটনায় এস এম আল নাহিয়ান বাগেরহাট জেলা সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে ভূমি নিরোধ ও প্রতিরোধ আইনে দুটি মামলা দায়ের করেন (সি.আর ৩৬৮/২৪ ও সি.আর ১৯৯/২৪)। সি.আর ৩৬৮/২৪ মামলায় তদন্ত শেষে আদালত মিজানুর রহমান স্বপন ও তার স্ত্রীসহ সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেন।
ভুক্তভোগীদের দাবি, গ্রেফতারি পরোয়ানা জারির পর আসামিরা উচ্চ আদালত থেকে জামিন নিয়ে বর্তমানে পলাতক রয়েছেন। সম্প্রতি তারা জমিটি অন্যত্র বিক্রির অপচেষ্টা চালাচ্ছেন বলে অভিযোগ ওঠে। গত ৬ নভেম্বর ২০২৫ তারিখে পুলিশের উপস্থিতিতে স্থানীয়দের মধ্যস্থতায় উভয় পক্ষকে সমঝোতার পরামর্শ দেওয়া হয়। এ সময় স্বপন দম্পতি ছয় মাসের মধ্যে টাকা পরিশোধের অঙ্গীকার করেন এবং অবশিষ্ট বন্ধকমুক্ত জমি জামানত হিসেবে এস এম আল নাহিয়ানের নামে রেজিস্ট্রি করে দেওয়ার ঘোষণা দেন।
এ বিষয়ে অভিযুক্ত মিজানুর রহমান স্বপনের ব্যবহৃত মুঠোফোন নম্বরে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও ফোনটি বন্ধ পাওয়া যায়। রুপসা ব্রিজ সংলগ্ন তার বাড়ি ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান খান জাহান আলী অটো চিড়া মিল তালাবদ্ধ অবস্থায় পাওয়া গেছে।
মন্তব্য করুন